মতামত
মতামত নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ইসলামী ব্যাংকে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ
ইসলামী ব্যাংকে দীর্ঘদিনের নিয়োগ-অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। চাকরি হারানো কর্মীদের পুনর্বহালের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন এবং রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সচিবালয় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টির পর এই প্রতিবেদন পরিস্থিতিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনসম্মত সমাধানের দিকে নেয়ার সুযোগ এনেছে। এখন প্রয়োজন প্রকৃত অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ইসলামী ব্যাংককে দক্ষ, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। চার দশকের বেশি সময়ে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আমানতকারী ও গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির গ্রাহকসংখ্যা প্রায় তিন কোটি, আমানত প্রায় এক লাখ ৮১ হাজার ৮২০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ প্রায় এক লাখ ৮৬ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। ৪০০ শাখা, ২৭১ উপশাখা, প্রায় দুই হাজার ৮০০ এজেন্ট আউটলেট ও তিন হাজার ৪০টি এটিএম/সিআরএম বুথের মাধ্যমে এর কার্যক্রম সারা দেশে বিস্তৃত। আমদানি-রফতানি, প্রবাসী আয়, কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার সদস্য ও ৩০ হাজার গ্রামের সাথে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, যাদের ৯২ শতাংশই নারী। দারিদ্র্য বিমোচন, স্ব-কর্মসংস্থান, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে অর্থায়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক উন্নয়নেও এর বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। 
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংকের অর্জন উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য ব্যাংকারের বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র ব্যাংক হিসেবে স্থান পাওয়ার পাশাপাশি ইসলামী অর্থায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও প্রবাসী আয় সংগ্রহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি দেশী-বিদেশী অনেক পুরস্কার পেয়েছে। বর্তমান সঙ্কটের সমালোচনা করতে গিয়ে এসব অর্জন উপেক্ষার যেমন সুযোগ নেই, তেমনই অর্জনের কারণে পরবর্তী অনিয়মকে আড়াল করাও সমীচীন নয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের আন্দোলন নতুন অস্থিরতা তৈরি করে। একই সময়ে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও নজরে এসেছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত বিনিয়োগ বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা এবং প্রয়োজনীয় সংস্থানের তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা ছিল। একই সাথে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার মালিকানা নিয়ে মালিকানা কাঠামো ও ভবিষ্যৎ মূলধন ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সবশেষ দুই বছর লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় ২০২৬ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারকে ‘জেড’ শ্রেণীতে স্থানান্তর করেছে। এসব সূচক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু চাকরিচ্যুতদের আন্দোলন হিসেবে নয়, ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারী ও গ্রাহকদের আস্থার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটেই নিয়োগ-অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে আট হাজার ৫৪২ জনকে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি ও লিখিত পরীক্ষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময় মোট নিয়োগের প্রায় ৭৯ শতাংশই হয়েছে অনিয়মের মাধ্যমে। নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিয়মের একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ২০১৯ সালের ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগের ঘটনায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জন প্রার্থীকে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হলেও লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ৩৬ জন ৫০ শতাংশ নম্বর পান। পরে পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয় এবং ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। লিখিত পরীক্ষা না দিয়েও কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার তথ্য এসেছে। একই সময়ে দুই হাজার ২৩২ জন প্রশিক্ষণার্থী সহকারী কর্মকর্তা, দুই হাজার ৮২৮ জন প্রশিক্ষণার্থী সহকারী কর্মকর্তা-ক্যাশ এবং ৫০১ জন প্রশিক্ষণার্থী জুনিয়র কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞপ্তি না দেয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব তথ্য তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হলে তা ব্যাংকের মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। একটি ব্যাংকের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য এটি বড় সতর্কবার্তা।
এই সময়ে ব্যাংকের কর্মীসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে কর্মীসংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৫১৫; ২০২৪ সালের দিকে তা বেড়ে ২১ হাজার ৭০৬-এ পৌঁছায়, যদিও এ সময়ে প্রায় দুই হাজার কর্মী অবসরে যান। ব্যবসা ও শাখা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কারণে জনবল আংশিক বৃদ্ধির যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু পুরো বৃদ্ধি অপ্রয়োজনীয় এমন বলা যাবে না। তবে এত বড় জনবল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়োগের স্বচ্ছতা, কর্মীদের উৎপাদনশীলতা, ব্যয় এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন— সবকিছুর মূল্যায়ন জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ওই সময়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের আট হাজার ৯৯ জন চট্টগ্রাম জেলার এবং পাঁচ হাজার ১৪৮ জন পটিয়া উপজেলার। অর্থাৎ মোট নিয়োগের প্রায় ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ চট্টগ্রাম জেলা থেকে এবং ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ শুধু পটিয়া উপজেলা থেকে এসেছে। স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ঘনত্ব প্রশ্ন তৈরি করে। পটিয়ায় এস আলমের বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য বাক্স রাখার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব তথ্য তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যাংকটির নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছিল, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলবে। 
নিয়োগের আর্থিক প্রভাবও উপেক্ষার সুযোগ নেই। ইসলামী ব্যাংকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরিচালন ব্যয় ২০২৩ সালের ৩৭ হাজার ৭২৭ মিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৪ সালে ৪১ হাজার ৮৫৩ মিলিয়ন টাকায় বেড়েছে, যা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি। অবশ্য এই পুরো ব্যয়বৃদ্ধি নিয়োগ-অনিয়মের ফল এমন নয়; মুদ্রাস্ফীতি, ব্যবসার পরিধি, প্রযুক্তি ও শাখা কার্যক্রমসহ নানা কারণে ব্যয় বাড়তে পারে। তবে একই সময়ে বিপুল জনবল বৃদ্ধির কারণে মানবসম্পদ ব্যয়ের দক্ষতা যাচাই জরুরি। ২০২৪ সালে কর-পূর্ব মুনাফাও প্রায় এক হাজার ২১ কোটি টাকায় নেমে আসে, যেখানে ২০২৩ সালে তা ছিল প্রায় এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তাই মুনাফা হ্রাসের সব দায় নিয়োগ-অনিয়মের ওপর চাপানো যেমন ঠিক হবে না, তেমনই ব্যয় ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
পরবর্তী সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় পাঁচ হাজার ৩৭৩ জনের মধ্যে মাত্র ৪০২ জন অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন; চার হাজার ৯৭২ জন অংশ নেননি। পরে চার হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত মূল নিয়োগের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত বিচার নয়; বরং চাকরিবিধি অনুসরণ করে দেয়া সুযোগ গ্রহণ না করা এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার সাথে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্ষতির মানবিক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, আইনগত প্রক্রিয়া ও আমানতকারীর স্বার্থও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইন, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে নৈতিক দায়ের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের নামের সাথে ‘ইসলামী’ শব্দটি যুক্ত থাকায় মানুষের প্রত্যাশা শুধু আর্থিক সেবায় সীমাবদ্ধ নয়; ন্যায়, আমানতদারি, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতারও উচ্চ মানদণ্ড প্রত্যাশিত। ইসলামে আমানত রক্ষা ও ন্যায়বিচারের ওপর যে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, ব্যাংক পরিচালনায় তার বাস্তব প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। 
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এই সঙ্কট থেকে স্থায়ী শিক্ষা নেয়া। বাংলাদেশ ব্যাংককে তদন্ত ও নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে ব্যাংক পরিচালনার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণ এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবস্থাপনাকে জনবলের দক্ষতা, উপস্থিতি, দায়িত্বপালন ও গ্রাহকসেবার মান নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনকে শুধু অতীতের অনিয়মের হিসাব-নিকাশ হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। এখন প্রয়োজন অস্থিরতা দীর্ঘায়িত না করে আইনসম্মতভাবে বিরোধের নিষ্পত্তি, সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। চাকরিচ্যুতির বিষয়ে কোনো আইনগত বা ন্যায়সঙ্গত প্রশ্ন থাকলে তার সমাধানও প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনসম্মত পথেই হওয়া উচিত। একই সাথে আমানতকারী ও গ্রাহকের স্বার্থ, ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও রক্ষা করতে হবে।


লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

Mizan12bd@yahoo.com