মতামত
মতামত নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বর্ষা এলেই বাঙালির রসনা খোঁজে ইলিশের স্বাদ। পদ্মার ইলিশ, মেঘনার ইলিশ, মোহনার ইলিশে বাজার সয়লাব হয়ে যায়। পছন্দের এবং সামর্থ্যরে ইলিশ কিনে বাড়িমুখো বাঙালির হাসি হাসি মুখের ছবি আজকের নয়। ইলিশের মৌসুমে ইলিশ ঢোকেনি এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া একসময় দুষ্কর ছিল। বিশেষ করে পূজার মৌসুমে ইলিশ ছাড়া অনুষ্ঠান ভাবাই যেত না। ইলিশ ছাড়া সনাতনধর্মীদের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল অভাবনীয়। অর্থাৎ ইলিশের মৌসুমে গ্রামবাংলা ইলশেগুড়ি বৃষ্টির ছন্দে মেতে উঠত ইলিশ আনন্দে। মাঝখানে যোগ হওয়া নববর্ষে পান্তা ইলিশের ধারণা ইলিশের মর্যাদা যেন একধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন সাইজের ইলিশের মূল্যের উল্লম্ফনও দেখা যায় এই উপলক্ষে। বৈশাখের সূচনায় ইলিশ কিভাবে জায়গা করে নিলো এ নিয়ে কেউ ভাবে না। এটি যে আবহমানকাল থেকে চলে আসা পয়লা বৈশাখের ওপর তথাকথিত শহুরে ব্যবসায়িক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পূজার মৌসুমের জের ধরে বাজার আর একবার ইলিশের চালানে ভরে উঠত। কারণ জামাই ষষ্ঠিতে জোড়া ইলিশ চাইই চাই। এভাবেই বিভিন্ন পালা-পার্বণে জীবনাচারে ইলিশ এ দেশের মানুষের জীবনে জড়িয়ে আছে আবহমানকাল থেকে। ইলিশের বাজারে পদ্মার ইলিশের কদর সবার উপরে। ইলিশের রাজধানী চাঁদপুর। একসময় বাড়িতে ইলিশ রান্না হলে আশপাশের বাড়ির লোকজনও টের পেত, পাশের বাড়িতে ইলিশ রান্না হয়েছে। খাওয়ার পর দিনভর হাতে মুখে লেগে থাকা ইলিশের সুবাসের কথা এখনো বয়োজ্যেষ্ঠরা স্মরণ করেন। এসব কথা আজ বিস্মৃতপ্রায়। এখন চাঁদপুরের ইলিশ, পদ্মার ইলিশ, সমুদ্রের ইলিশ, মিয়ানমারের ইলিশ বা গুজরাটের ইলিশ সব একাকার। মাঝখানে শোনা গিয়েছিল ওমানের ইলিশের কথা। বাজারে এখন ইলিশ চেনা বড় দায়। এটি আসলেই ইলিশ নাকি ইলিশের মতো দেখতে অন্য প্রজাতির মাছ কে বলবে? সবই চলে ইলিশের নামে।
এখন প্রকৃতি বদলেছে। বদলেছে বর্ষার রূপ। বর্ষায় দিনভর বৃষ্টির অঝোর ধারা আর নেই। নেই অবিরাম বর্ষণে নদী খাল বিলে উজিয়ে আসা মাছ ধরার নয়নাভিরাম দৃশ্য। নদীর বুকভরা অথৈ পানির দৃশ্য আজ শুধুই কল্পনা। বর্ষার সাথে সাথে চরিত্র বদলেছে ইলিশেরও। নদীর মিষ্টি পানির কথা না হয় বাদই দিলাম— এখন  মোহনার অথবা সমুদ্রের নোনা পানিতেও দেখা মেলে না ইলিশের। ইলিশ যেন হারিয়ে গেছে। মাত্র ক’বছর আগেও যখন মাছ ধরার ট্রলারগুলো ফিরতি যাত্রায় ট্রলার প্রতি গড়ে ২০০-২৫০ মণ ইলিশ নিয়ে ফিরত সেখানে এখন ফেরে সাকুল্যে ৩০-৫০ মণ ইলিশ নিয়ে। চাঁদপুরে যেখানে দুই-তিন বছর আগেও মৌসুমে প্রতিদিন বেচাকেনা হতো দুই হাজার মণের মতো, সেখানে এখন গড়ে প্রতিদিন মাছ ওঠে ২৫০ মণের মতো। জেলেরা বুকভরা আশা নিয়ে আগাম ঋণ নিয়ে যায় মাছের আশায়। কিন্তু ফিরতিতে তাদের দাদনের টাকা ওঠাই দায়। এভাবেই জেলেরা দিন দিন ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে আষ্টেপৃষ্ঠে। অনিয়ন্ত্রিত নদীদূষণ, নদী ভরাট, ডুবোচর, জাটকা নিধনের প্রতাপে কমেছে ইলিশের প্রাপ্যতা। কমছে ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রের আয়তন। নদী ও সমুদ্র দূষণের ফলে ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্র পরিবর্তন করেছে। ফলে দিন দিন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। উপরন্তু ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মার চরিত্র বদলেছে। হারিয়ে গেছে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র।
একদিকে সরবরাহ ঘাটতি। অন্যদিকে চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ইলিশের দাম। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, ২০২৩ সালে এক কেজি ইলিশের গড় দাম ছিল এক হাজার ২০০ টাকা। কৃষি বিপণন অধিদফতরের হিসাব মতে, ২০২৪ সালেও এক কেজি ওজনের ইলিশের গড় মূল্য ছিল এক হাজার ১৫০ টাকার মতো। একই সাথে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের গড় দাম ২০২৪ সালে ছিল ১৬ শ’ থেকে ১৮ শ’ টাকা। ৭৫০ গ্রাম থেকে ৯০০ গ্রাম সাইজের ইলিশের গড় মূল্য ছিল ৮০০ থেকে হাজার টাকার মধ্যে। ২০২৫ সালে হঠাৎ করেই বাজার থেকে উধাও হয় ইলিশ। এক থেকে দেড় কেজি সাইজের ইলিশের মূল্য এক লাফে উঠে যায় আড়াই হাজার ২৮ শ’ টাকায় ; যা খুচরা দোকানে দাঁড়ায়  তিন হাজার ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বাজার নিয়ন্ত্রণক কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কথাও ইদানীং শোনা যায়।  ইলিশ ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, অধিকাংশ ইলিশ বিক্রি হয়ে যায় এসব কোম্পানির কাছে। তারা এগুলো সারা বছর ধরে নিয়ন্ত্রিত সরবরাহের জন্য ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করেন। সরবরাহব্যবস্থা এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় যেন নির্দিষ্ট দামের নিচে ইলিশ বিক্রি না হয়। খেয়াল করলেই দেখা যায়, ইলিশের খরা মৌসুমেই বাজারে প্রচুর ইলিশের সরবরাহ।
চাহিদা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রিত সরবরাহের এই সুযোগে আরেক শ্রেণীর ব্যবসায়ী প্রতিবেশী দেশ থেকে প্রচুর স্বল্পমূল্যে ইলিশ আমদানি করে বাজারে ছেড়েছেন। এনবিআরের হিসাব মতে,  চলতি বছর ৯ মাসে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে চার লাখ ২৭ হাজার কেজি ইলিশ। এগুলোর গড় আমদানি মূল্য ৭০০ টাকা প্রতি কেজি। আমদানির পর এগুলো বাজারে চলে গেলেই মূল্যমান কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ডিমভরা বেশ বড় সাইজের লোভনীয় এই ইলিশগুলো বিক্রি হয় প্রতি কেজি গড়ে আড়াই থেকে ২৮ শ’ টাকায়। দেখতে নয়ন ভোলানো হলেও এগুলোর স্বাদ দেশীয় ইলিশের মতো নয়। 
এভাবেই এখন বাজারে, রান্নাঘরে দেশীয় ইলিশের মোড়কে বিদেশী ইলিশের ঝাঁজ। এ ব্যাপারে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। শুধু জাটকা নিধনে নিষেধাজ্ঞা বা নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ নয়, কমাতে হবে নদীদূষণ, করতে হবে ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণ। জেলেদের দাদন প্রথা থেকে রক্ষার বিকল্প নেই। বিদেশী ইলিশ আমদানি রোধ করতে হবে যেকোনো মূল্যে। ইলিশের সিন্ডকেট-ভাঙার কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি মূল্য নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ না নিলে হারিয়ে যাবে জাতীয় মাছ ইলিশ। বাজারে এবং রান্নাঘরে রাজত্ব করবে বিদেশী বিজাতীয় ইলিশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জাতীয় মাছের সাথে পরিচিতির জন্য নিয়ে যেতে হবে ফিশ মিউজিয়ামে। 


লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

shah.b.islam@gmail.com