
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘রাজনৈতিক বিপদ’ ও ‘রাজনৈতিক সঙ্কট’ দু’টি ভিন্ন প্রত্যয়। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিকে’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করে, তখন তা প্রথমে ‘আপদ’ এবং ক্রমে ‘বিপদ’-এ রূপান্তরিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি প্রচলিত ঘটনা এখানে স্মরণযোগ্য। একবার এক ইংরেজ কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপদ’ ও ‘বিপদ’-এর পার্থক্য কী? বঙ্কিমচন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তুমি একজন ইংরেজ হয়ে আমাকে এই প্রশ্ন করছ, এটা আপদ। আর তোমরা ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখল করে আছো, এটাই বিপদ।’ আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গে এই রূপকটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, বিরোধী মত দমন করেছে, গুম-খুন-বিচারবহির্ভূত হত্যাকে রাষ্ট্রীয় হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সেটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য ‘আপদ’। আর যখন সেই দল ক্ষমতাচ্যুত হয়েও দেশের স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেটি নিঃসন্দেহে ‘বিপদ’।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যাত্রা বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা যায়, ক্ষমতায় গিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন, ক্ষমতার বাইরে গিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি। ১৯৭২-৭৫ সময়কালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং রক্ষীবাহিনীর সন্ত্রাস দেশকে গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত করেছিল। স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেনজিং সোসাইটিজ’ গ্রন্থে যে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়’-এর কথা বলেছেন, বাকশাল ছিল তার ধ্রুপদী উদাহরণ। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২৪— টানা ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে নজিরবিহীন ফ্যাসিবাদ। ভোটারবিহীন নির্বাচন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (ডিএসএ) সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, বিরোধী দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা। ফ্রিডম হাউজের সূচকে বাংলাদেশ ‘আংশিক মুক্ত’ থেকে ‘মুক্ত নয়’ বিভাগে নেমে গিয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ একাধিকবার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন থেকে নির্বাচন কমিশন— কোনো প্রতিষ্ঠানই আওয়ামী লীগের দলীয়করণ থেকে রক্ষা পায়নি। জুলাই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সেই দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়েছে শত শত তরুণের রক্তের বিনিময়ে। কিন্তু আওয়ামী ‘আপদ’ থেকে মুক্তি মিললেও ‘বিপদ’ এখনো শেষ হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই ‘বিপদ’-এর স্বরূপ স্পষ্ট করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ এবং পরিকল্পিত নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকে ককটেল বিস্ফোরণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে বাসে আগুন— এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিত নাশকতার অংশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এসব নাশকতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাজ এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় পরিচালিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নিশ্চিত করেছেন, অগ্নিকাণ্ড, ককটেল বিস্ফোরণের পেছনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগই দায়ী। গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, বিভিন্ন স্থানে তাদের সমর্থকদের গ্রেফতার হওয়া প্রমাণ করে, দলটি সংগঠিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ তাদের ১৬-১৭ বছরের শাসনামলে দেশকে কারাগারে পরিণত করেছিল। এটি সেই ‘আপদ’ যা ‘বিপদ’-এ রূপ নিচ্ছে, কেননা, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও জনজীবনের নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে।
কিন্তু আওয়ামী লীগের ‘বিপদ’ কেবল অভ্যন্তরীণ নাশকতায় সীমাবদ্ধ নয়। ভারত সংযোগটিই এই বিপদকে ভূরাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪-এ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করছেন। সম্প্রতি এনডিটিভিতে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন এবং কারাবাস বা যেকোনো আইনি পরিণতি মেনে নেয়ার কথা বলেছেন। দিল্লিতে বসে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সাথে বৈঠক, দেশে ফেরার পরিকল্পনা প্রকাশ— এগুলো কেবল একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এর পেছনে ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন আছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রশ্ন হলো— ভারত কেন একজন পলাতক আসামিকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং তাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিচ্ছে? জাতিসঙ্ঘ সনদের ২(৭) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ— ভারতের এই আচরণ কি সেই নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন নয়? বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করেছে; কিন্তু ভারত সেই দাবিতে সাড়া না দিয়ে, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সঙ্কট আরো গভীর করেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা আরো উদ্বেগজনক। সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকদের নিহত হওয়ার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন— যার মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনে। ২০১৪ থেকে ২০২৬-এর প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় ২৮৫ জন বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন— বছরে গড়ে প্রায় ২৪ জন। সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো— ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ২৭ জন বাংলাদেশী নাবালক শিশু বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে; শুধু ২০২৪ সালেই নিহত হয় ছয় শিশু। এত হত্যার পরও বিএসএফের একজন সদস্যেরও বিচার হয়নি। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। সীমান্তে ‘পুশইন’ অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিকদের জোর করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়া— এই নতুন হুমকিও যুক্ত হয়েছে। বিজিবি এই পুশইন চেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছে। সীমান্তে বাংলাদেশী জেলেদের নৌকা আটক, গুলি চালিয়ে আহত ও নিহত করার ঘটনাও ঘটেছে। এই সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এখন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পানি ইস্যু আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ‘বিপদ’। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি— যা ২০১১ সালে প্রায় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে আটকে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও এই চুক্তি আদায় করতে পারেনি— কেননা, ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল আনুগত্যের, সমতার নয়। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে বঞ্চিত হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার পানি প্রবাহ হ্রাস, উত্তরবঙ্গে মরুকরণ প্রক্রিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি— এগুলো জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশগত অস্তিত্বের প্রশ্ন যা আওয়ামী লীগের ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির কারণে কখনো জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়নি। আওয়ামী লীগ ভারতকে খুশি রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের পানি অধিকার জলাঞ্জলি দিয়েছে, এটি জাতির বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা।
এখানেই ‘আপদ’ ও ‘বিপদ’-এর পার্থক্যটি সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন ভারতের সাথে একটি অসম সম্পর্কের কাঠামো তৈরি হয়েছিল— ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধা দেয়া হয়েছে, সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে কণ্ঠস্বর ছিল ক্ষীণ, ভারতীয় পণ্যে বাজার সয়লাব হয়েছে, তিস্তার পানি আদায়ে ব্যর্থতা মেনে নেয়া হয়েছে। এটি ছিল ‘আপদ’-দৈনন্দিন জীবনে অস্থিরতা, জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি এবং দেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্বের ক্রমক্ষয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই একই সম্পর্ক ‘বিপদ’-এ রূপান্তরিত হয়েছে— ভারত একটি পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, সীমান্তে হত্যা ও পুশইন চালিয়ে চাপ প্রয়োগ করছে এবং বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করছে। ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হয় মিত্র, নয় প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যে প্রতিবেশী পরাজিত শত্রুকে আশ্রয় দেয়, সে কখনো প্রকৃত মিত্র হতে পারে না। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও একই কথা আছে, ‘রাজমণ্ডল’ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিবেশী রাষ্ট্র সর্বদা সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তার সাথে সম্পর্ক শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে, আবেগের ওপর নয়।
অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না— এই প্রশ্নটি এখন বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই অনিশ্চয়তাই হলো ‘আপদ’-এর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা। যারা আওয়ামী লীগের পতনে স্বস্তি পেয়েছেন, তারাও আশঙ্কায় রয়েছেন, কেননা দলটির আন্তর্জাতিক সংযোগ, বিশেষত ভারতের সাথে সম্পর্ক, একটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে যা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সমাধানযোগ্য নয়। ‘বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ বা শেখ পরিবারের বাইরে নতুন নেতৃত্বের আলোচনা, বিভিন্ন নাম সামনে আসা— এগুলো ইঙ্গিত দেয়, দলটির অভ্যন্তরেও পরিবর্তনের চাপ রয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন কতটা প্রকৃত এবং কতটা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কৌশলের অংশ, সেটি গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে তীব্র বিভাজন ও মনস্তাত্ত্বিক সঙ্ঘাত তৈরি হয়েছে, তার অবসান ঘটানো গেলে ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, সেটিও ধীরে ধীরে কমতে পারে; কিন্তু তার জন্য ভারতকেও তার প্রতিবেশী-নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ বহুমুখী ও জটিল। এক দিকে আওয়ামী লীগের নাশকতা, ককটেল বিস্ফোরণ ও পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে, অন্য দিকে ভারতের সাথে একটি আত্মমর্যাদাশীল কিন্তু বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। একই সাথে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজও চলমান। বর্তমান সরকারের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি— যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সাথে সম্পর্ক জোরদার, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাতিসঙ্ঘ সফর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ— এগুলো বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্প প্রসারিত করেছে।
ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ আর একমুখী নির্ভরতার পথে হাঁটবে না। ভারতের উচিত একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে প্রতিবেশী হিসেবে গ্রহণ করা— আওয়ামী লীগের মতো একটি অনুগত দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখার কৌশল আর কাজ করবে না। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত রাজনীতি আরো জাতীয়তাবাদী মোড় নিয়েছে, যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলেছে।
ইবনে খালদুনের ‘আল-মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের উত্থান-পতন বিশ্লেষণে ‘আসাবিয়া’ (মৎড়ঁঢ় ংড়ষরফধৎরঃু) ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। খালদুন দেখিয়েছেন, যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের সংহতি হারায়, সে শেষ পর্যন্ত নাশকতা ও সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়, এটিই তার পতনের চূড়ান্ত পর্ব। আওয়ামী লীগ আজ ঠিক সেই পর্বে রয়েছে। ককটেল, অগ্নিসংযোগ ও ভারতীয় আশ্রয়ে বসে ষড়যন্ত্র— এগুলো রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পথ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক শক্তির চূড়ান্ত নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। যে দল স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বের গৌরব দাবি করে, সেই দলই আজ নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, ইতিহাস এই বৈপরীত্য ক্ষমা করবে না। বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন এই ‘আপদ-বিপদ’-এর চক্রে আটকে রাখা সম্ভব নয়। দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনই এই মুহূর্তে জাতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং সেই লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ
নামক ‘আপদ-বিপদ’ থেকে মুক্তির পথটি জনগণই খুঁজে নেবে, যেমনটি তারা জুলাই চব্বিশে খুঁজে নিয়েছিল।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়








