ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে নিম্নমানের বই ছাপছে রেদওয়ানিয়া প্রেস

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মূদ্রণে বেশ কিছু প্রেসের কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বারবার তাগিদ দেয়ার পরেও তারা নিম্নমানের ছাপা, ঝাঁপসা মূদ্রণ, নকল কালি, গাম, গ্লু এবং  বইয়ের কাটিংয়েও কারচুপি করছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড  (এনসিটিবি) থেকে কয়েক দফায় সতর্ক করা হলেও নিম্নমানের বই ছাপার কাজ অব্যাহত রেখেছে রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স। ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে এই  প্রেসটি  এনসিটিবি কর্মকর্তা এবং পিডিআই এজেন্ডের লোকজনসহ পরিদর্শন টিমের সদস্যদের সাথেও প্রতারণা করছে। বেসরকারি মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের (পিডিআই কোম্পানি) অব্যাহতভাবে মনিটরিং করার পরেও তারা কৌশলে নিম্নমানের বই মুদ্রণ এবং কাটিংয়ের কাজ অব্যাহত রেখেছে। তবে গতকাল থেকে নিম্নমানের বই ছাপার কাজে জড়িত রেদওয়ানিয়া প্রেসসহ এমন এক ডজন প্রেসকে কঠোর নজরদারিতে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। 
গতকাল মঙ্গলবার অপরাহ্নে ডেমরার মাতুয়াইলে রেদওয়ানিয়া প্রেসে গিয়ে বইয়ের কাটিংয়ে ব্যাপক অনিয়ম আর কারচুপির ঘটনা নজরে পড়ে এনসিটিবি এবং পিডিআই এজেন্টের কর্মকর্তাদের। এই প্রেসের মালিককে এর আগে নিম্নমানের নকল কাগজ ব্যবহারের জন্য এনসিটিবিকে শোকজও করেছিল। এনসিটিবি সূত্র জানায়, রেদওয়ানিয়া প্রেসের বিরুদ্ধে মানহীন কাগজে বই ছাপার জন্য এর আগে কড়াভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সূত্র জানায়, বই মুদ্রণের শুরুর দিকেই মানহীন একটি কাগজ মিল থেকে তারা বই ছাপার কাজে নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশনের বাইরে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করেছে। আর এ কারণে রেদওয়ানিয়া প্রেসের প্রায় এক লাখ ফর্মার বেশি কাগজ জব্দ করে সেগুলো ধ্বংসও করা হয়। 
সূত্র জানায়, রেদওয়ানিয়া প্রেস এবার প্রাথমিকের বই মুদ্রণের কাজে একটি লটের (লট নং-৩২৭) মোট পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৪ কপি বই মুদ্রণের কাজ পায়। কিন্তু শুরু থেকেই নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করার কারণে তারা এনসিটিবির নজরদারিতে রয়েছে। কিন্তু এর পরেও তারা কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রাথমিকের শিশু শিক্ষার্থীদের এই বই কাটিংয়ে কারচুপি করেছে। অপর দিকে রেদওয়ানিয়া প্রেসের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা নিজেদের প্রেসের ঠিকানা ভুল দিয়ে এনসিটিবি কর্মকর্তা, পিডিআই কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয় পরিদর্শন টিম এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথেও প্রতারণা করেছেন। তারা ঠিকানা ব্যবহার করেছেন ২৮, বাংলাবাজার। কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রেস মাতুয়াইল, যাত্রাবাড়িতে অবস্থিত বলে প্রেসের মালিক নিজেই স্বীকার করেছেন। 
এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছু প্রেসে শুরু থেকেই নানা কৌশলে নিম্নমানের বই মুদ্রণের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছে। এ জন্য ইতোমধ্যে প্রায় এক ডজন প্রেসকে সতর্ক করে নোটিশও দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে লেটার অ্যান্ড কালার, গ্লোবল প্রিন্টিং ইকুইপমেন্ট, বর্ণশোভা মুদ্রায়ণ, ভাই ভাই প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, আনন্দ প্রিন্টার্স, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, দোয়েল প্রিন্টার্স এ রকম প্রায় এক ডজন প্রেসকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।  
রেদওয়ানিয়া প্রেসের মালিক শহিদুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় এই প্রতিবেককে বলেন, প্রথম দিকে আমার কাগজে কিছুটা সমস্যা ছিল তবে আমাকে সতর্ক করার পরেই আমি অন্য কোম্পানি থেকে কাগজ কিনেছি। আর আজকে (গতকাল মঙ্গলবার) আমার প্রেসে  মুদ্রিত বইয়ের কাটিংয়ে কিছু সমস্যা ধরা পরেছে। এটা খুব বড় সমস্যা নয়। এটাও আমি সাথে সাথে সমাধান করেছি। প্রেসে ভুল ঠিকানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাবাজারের ঠিকানাটি আমি আগে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমি নিজ উদ্যোগেই আগের সেই ভুল ঠিকানা সংশোধন করে এনসিটিবিতে জমাও দিয়েছি।  
নির্দিষ্ট সময়ে এবং ভালো মানের বই ছাপার কাজ নিশ্চিত করার জন্য প্রেসগুলোকে নজরদারি বিষয়ে এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর আবু নাসের টুকু নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এবার বইয়ের মানের বিষয়ে একচুলও ছাড় দেবো না। তাই শুরু থেকেই প্রত্যেকটি কপি প্রেসকে কঠোর নজরদারিতে রেখেছি। আমরা চেষ্টা করছি সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে যথাসময়ে দেশের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্পন্ন বই তুলে দিতে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা এখনো সময় এবং কাজের অগ্রগতির বিবেচনায় এগিয়ে আছি। সবার আন্তরিক চেষ্টায় আমরা ২০২৭ সালের পাঠ্যবই চলতি বছরের ৩০ নবেম্বরের মধ্যেই জেলা উপজেলায় পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।