
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিএনপি সরকারকে মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে হয়েছিল। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে আরো ১১টি বোয়িং কিনতে হচ্ছে। অন্য দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (্ইইউ) শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকারকে ১০টি এয়ারবাস কিনাতে হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এতগুলো বোয়িং ও এয়ারবাস স্বচ্ছতার সাথে পরিচালনার দক্ষতা ও যোগ্যতা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আছে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেননা বিদ্যমান উড়োজাহাজগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে বিমানের বাণিজ্যিক দক্ষতা ও যাত্রীবান্ধব আচরণের ঘাটতি নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠছে। বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণে য্ক্তুরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইইউর বাজার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এখন দুই পক্ষকে খুশি রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন বা সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক, ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে হচ্ছে, যদিও তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে দীর্ঘ মেয়াদে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে বা গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়া বন্ধ করতে দিল্লির কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। আজ শুক্রবার প্রথমবারের মতো দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সাংগঠনিক বিষয়ে শেখ হাসিনার সরাসরি মতবিনিময় করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ভারতীয় গণমাধ্যমে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক বক্তব্য রেখেছেন, যা বাংলাদেশ সরকার ভালোভাবে নেয়নি। ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের আপত্তির মুখে গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে শেখ হাসিনা দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস কাব আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছিলেন। এর পরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর ‘অনুকূল পরিবেশের অভাবে’ স্থগিত রাখা হয়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে বিমসটেক চেয়ার হিসাবে তারেক রহমানকে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হলে বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করে। বিষয়টি নিয়ে ব্রিকস সম্মেলনের পর দিল্লিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করা হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা কৌশলে এড়িয়ে গেছে। তবে আমন্ত্রণ জানানোর পরও ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা তার কোনো প্রতিনিধির অনুপস্থিতি যে ভারতকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে, তা আবারো হাসিনা কার্ড নিয়ে নড়াচড়া করার তৎপরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে।
গতকাল সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা বাণিজ্য চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য যথাযথ হয়নি। এই ধরনের চুক্তিতে নিজ দেশের সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে সমঝোতা করতে হয়। এ ছাড়া চুক্তিতে একটি ক্ষেত্রে ততটুকু ছাড় দেয়া যায়, যতটুকু অন্য ক্ষেত্রে অর্জন করা সম্ভব হয়। য্ক্তুরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তির কারণে শুল্কের ক্ষেত্রে আমরা যতটা ছাড় পেয়েছি, জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয়ে বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনাসহ তুলনামূলকভাবে বেশি দামে অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে গিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য চুকাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, তৈরী পোশাকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একক বৃহত্তম বাজার হলেও বাংলাদেশের জন্য একমাত্র রফতানি বাজার নয়। ইইউর বাজারে বাংলাদেশী পণ্য শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পায়। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দিতে গিয়ে ইইউর বাজারসুবিধা ধরে রাখতে আমাদের কঠিন দরকষাকষির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ২৫টি বোয়িংয়ের পাশাপাশি ১০টি এয়ারবাস কেনার বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত হয়তো তারই প্রতিফলন। বিএনপি সরকার যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইতঃপূর্বে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি অসম হয়েছে, তবে তারা সেটা পর্যালোচনা করতে পারে। পর্যালোচনার পর সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চুক্তির যেসব শর্ত বাংলাদেশের স্বার্থের সরাসরি প্রতিকূলে গিয়েছে, তা শোধরানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করা যেতে পারে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেয়া সম্পর্কে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, সাধারণভাবে বলা যেতে পারে বাংলাদেশ যদি মনে করে কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেয়া প্রয়োজন, তবে তার কাজের মধ্যেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। আর যদি অন্যদের মন রক্ষার জন্য এই ধরনের চুক্তিতে সই করা হয়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে তা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে পারে। তিনি বলেন, এটা প্রমাণিত যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো দেশ যত বেশি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তার জন্য সুযোগও তত বেশি অবারিত থাকে। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখাটা আমাদের গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত।
ওপরে ওপরে ভারতের সাথে বৈরিতা দেখিয়ে ভেতরে ভেতরে দেশটিকে বেশি ছাড় দিয়ে দিলাম কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে মন্তব্য করে মাহফুজুর রহমান বলেন, ভারতের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশে কোনো সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে কি নাÑ তা নিয়ে সন্দেহ থাকে। আর উল্টোটা হলে জনগণ ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সরকারকে প্রশ্ন করতে থাকে, যার সন্তোষজনক জবাব দেয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আগামী ডিসেম্বরে ভারতের সাথে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এই চুক্তি না হলে পদ্মা ব্যারাজ করা কঠিন হবে, কেননা নদীর পানিপ্রবাহ সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাওয়া যাবে না। তিস্তার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই মতপার্থক্য রয়েছে এমন ইস্যুগুলোতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেও ভারতের সাথে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় দায়িত্ব নেয়ার পরপরই গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আয়োজন করার জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু এতে সফল না হলেও তিনি দমে যাননি। ত্রিবেদী ধারাবাহিকভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোতে আলোচনা করছেন। কিন্তু দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো নিয়ে সে দেশের মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনায় সেভাবে তৎপর দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ‘শেখ হাসিনাকে ভারত কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করে’ এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় না দেয়ার কোনো কারণ ভারতের ছিল না। কেননা হাসিনা সরকারের সাথে ভারতের ভালো সম্পর্ক ছিল। হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ঢাকা কয়েকবার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে প্রত্যর্পণ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ সরকার এখনো তা শুরু করেনি। হাসিনা যদি ফিরে যেতে চান, তবে ভারত তাকে বাধা দেবে না। তবে তিনি বাংলাদেশে ফিরলে তার সাথে কী আচরণ করা হবে, তা জানতে চাইবে ভারত।
শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে বাধাগ্রস্ত করেছে কি নাÑ জানতে চাইলে এ কূটনীতিক বলেন, ভারত সরকার হাসিনাকে (বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকার) পরামর্শ দিতে পারতো। কিন্তু বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কাউকে কি কথা বলা থেকে আটকানো যায়? আর হাসিনাকে আমরা কোনো বন্দিশালায় রাখিনি। তিনি নিজ ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা সম্ভব কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, এটি অবশ্যই সম্ভব, তবে তালি দুই হাতে বাজে। ভারত যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখিয়েছে, এখন বল ঢাকার কোর্টে। তারা যদি সম্পর্ক নি¤œ পর্যায়ে রাখতে চায়, তবে তাই হবে। তবে ভারতের মূল নজর থাকবে সম্পর্কের মৌলিক স্তম্ভগুলোর ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা অর্থনীতি। আর সাধ্যমতো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দিয়ে ভারতকে তা সহায়তার চেষ্টা করতে হচ্ছে।







