বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান নিরাপত্তা কৌশল

নয়া দিগন্ত ডেস্ক 

যে জমিতে একসময় বস্ত্র উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন অস্ত্র উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশলের পরবর্তী পর্যায়টি কেবল দেশের অভ্যন্তরে কী উৎপাদন করা সম্ভবÑ তার ওপরই নয়, বরং দীর্ঘকাল ধরে বজায় রাখা ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর সাথে বাহ্যিক অংশীদারিত্বের মধ্যে কিভাবে ভারসাম্য রা করা হয়, তার ওপরও নির্ভর করতে পারে। 
গত আগস্ট মাসের শেষ দিকে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ থাকা একটি টেক্সটাইল মিলের ৫৫ একর জমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার দণি-পূর্বের এই স্থানটিতে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ল্েয উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানিয়েছেন যে, এটি দেশের প্রতিরা সমতা বৃদ্ধির একটি উদ্যোগের অংশ। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা যেসব অস্ত্র বা গোলাবারুদ ব্যবহার করব, তা আমরা নিজেরাই উৎপাদন করব। কারণ আমদানিকৃত সরঞ্জাম দিয়ে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়।’ 
তবে ফৌজদারহাট উদ্যোগটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা, চীনের সহায়তায় চালকবিহীন বিমান উৎপাদনের উদ্যোগ, তুরস্কের সাথে প্রতিরা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ‘মক্কা প্রতিরা জোটে’ যোগ দেয়ার সম্ভাব্য আগ্রহÑ এসব বিষয় বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ কি ২০২৪-পরবর্তী সময়ে তার নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে, নাকি এসব ঘটনা দীর্ঘদিনের সামরিক আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ারই অংশ? বাংলাদেশের উদীয়মান প্রতিরা শিল্প, চীন ও তুরস্কের সাথে ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা এবং ‘মক্কা চুক্তি’র প্রতি সম্ভাব্য আগ্রহ দেশটির নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক আলোচনাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব ভারতের সাথে সম্পর্কের েেত্রও পড়তে পারে। 
প্রোপট বা অনুঘটক 
থিংকট্যাংক ‘বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর প্রেসিডেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, সামরিক সমতা বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টা ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশীদের মধ্যে গড়ে ওঠা জাতীয় আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সাথে সম্পর্কিত। ওই বছরই ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের প্রধানমন্ত্রীর শাসনের অবসান ঘটেছিল। তার মতে, সামরিক সমতা জোরদার করার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তারই একটি প্রতিফলন; তিনি আরো বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারি।’ 
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব:) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী এই ঘটনাপ্রবাহকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সরাসরি ফলাফল হিসেবে দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘সামরিক কৌশল ও পররাষ্ট্রনীতি হলো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। আমার মনে হয় না যে জুলাই ২০২৪-এর মতো কোনো একটি একক ঘটনা এগুলোর কোনোটিতেই আমূল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।’ 
তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদপেগুলোকে কেবল পুরনো সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। 
হুমায়ুন কবিরের মতে, দণি ও দণি-পূর্ব এশিয়ায় পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বাংলাদেশের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সঙ্কট এবং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাÑ এসবই দেশটির নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্তর্ভুক্ত। কবির বলেন, মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের প্রভাব যখন বাংলাদেশের ভূখণ্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন বাংলাদেশের আকাশ-প্রতিরা সমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনও এ ধারণাটি নাকচ করে দিয়েছেন যে বাংলাদেশ একটি সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে; বরং তিনি বলেন, দেশটি তার প্রতিরা সমতার ঘাটতিগুলো পূরণের চেষ্টা করছে। 
নতুন অংশীদার 
দীর্ঘদিন ধরেই চীন বাংলাদেশের জন্য প্রতিরা সরঞ্জামের একটি প্রধান উৎস। তবে দেশটির সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চীনের সাথে তাদের প্রতিরা সম্পর্ক এখন কেবল তৈরি সামরিক সরঞ্জাম বা হার্ডওয়্যার কেনার গণ্ডি ছাড়িয়ে আরো বিস্তৃত হচ্ছে। 
এ বছরের জানুয়ারি মাসে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং ‘চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর মধ্যে বাংলাদেশে একটি ইউএভি বা চালকবিহীন বিমান উৎপাদন ও সংযোজন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে চুক্তি স্বারিত হয়; এই চুক্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রীর একজন সহকারী জানান যে, চীনের তৈরি জে১০-সিই (ঔ১০-ঈঊ) যুদ্ধবিমান এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার জন্য একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
তুরস্কের সাথেও বাংলাদেশের প্রতিরা সহযোগিতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চলতি বছরের জুন মাসে বাংলাদেশ সফর করেন এবং প্রতিরা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেন। জুলাই মাসে বাংলাদেশ তুরস্কের সহযোগিতায় বগুড়ায় একটি ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
ফৌজদারহাটের উদ্যোগ ও বগুড়ায় প্রস্তাবিত ড্রোন কারখানার বিষয়টি একত্রে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের প্রতিরা সমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার আরেকটি দিক উন্মোচিত হয় : দেশটি কেবল সামরিক সরঞ্জামের উৎস বৈচিত্র্যময় করারই চেষ্টা করছে না, বরং নিজস্ব উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সমতাও গড়ে তুলতে চাইছে।
মক্কা চুক্তি ও আঞ্চলিক সমীকরণ 
চীন ও তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরা সহযোগিতা মূলত অস্ত্র, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সমতার ওপর কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও, ‘মক্কা চুক্তি’ দেশটির নিরাপত্তা নীতির বিষয়ে ভিন্ন একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। 
গত আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা প্রতিরা জোট’ গঠন বিষয়ক চুক্তিতে স্বার করে। বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য নয়। তবে ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সংসদে জানান, জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করে, তবে ঢাকা সদস্যপদ গ্রহণের বিষয়টি ‘ইতিবাচকভাবে বিবেচনা’ করবে। 
তবে এই জোটে যোগ দেয়ার সম্ভাবনাটি এমন প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, বাংলাদেশ কিভাবে তার দীর্ঘদিনের ‘জোট-নিরপে’ নীতির সাথে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। 
কবির মনে করেন, এই জোটে যোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার আগে বাংলাদেশের উচিত এর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করে দেখা। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরেÑ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়Ñ আমরা কোনো সামরিক জোটে যোগ দিইনি।’ তিনি তার পছন্দের অবস্থানটি এভাবে ব্যাখ্যা করেন : ‘আমরা কারো জোটে যোগ দেব না, তবে সবার সাথেই নিজেদের স্বার্থ রা করে চলব।’ 
ইশফাকও এই জোটে যোগ দেয়ার কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, বাংলাদেশের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো দণি ও দণি-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক; তাই অপোকৃত দূরবর্তী কোনো অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সামরিক জোটে যোগ দেয়ার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। 
বাংলাদেশের প্রতিরা সমতা জোরদার করার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো যে নয়াদিল্লির নজর এড়াবে না, তা বলাবাহুল্য। চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং ‘মক্কা চুক্তি’তে সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়Ñ উভয়ই ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 
এখন পর্যন্ত ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো সতর্ক পর্যবেণ; তারা সরাসরি কোনো আপত্তি জানায়নি। মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা এমন সব ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেণ করছে যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষক হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের উদ্দেশ্য কোনো দেশকে হুমকি দেয়া নয়। তবে তিনি একটি মূল উদ্বেগের কথাও স্বীকার করেন : ‘বাংলাদেশের সমতা বাড়লে যারা এখন বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আছে, তারা হয়তো ভাবতে পারে যে বাংলাদেশ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে কি না।’ 
নতুন নির্ভরতা নাকি কৌশলগত স্বাধীনতা? 
এখন প্রশ্ন হলো, একাধিক দেশ থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের ফলে বাংলাদেশ কি আরো বেশি কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জন করবে, নাকি একধরনের নির্ভরতার বদলে অন্য কোনো ধরনের নির্ভরতা তৈরি হবে? অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের েেত্র নিজস্ব সমতা বাড়ালে বাইরের উৎস থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের হাতে আরও বিকল্প থাকবে। তবে এ ধরনের শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হবে প্রযুক্তি, অর্থায়ন, দ জনবল এবং যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য উপকরণের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। 
বাংলাদেশ কি নতুন কোনো নিরাপত্তা জোট বা কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, নাকি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করাটা তাদের বৃহত্তর কোনো কূটনৈতিক কৌশলের অংশÑ তা এখনো অস্পষ্ট। 
একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়টি খোলা রাখলে ভারত ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সাথে দরকষাকষিতে ঢাকার অবস্থান আরো শক্তিশালী হতে পারে। সুতরাং বিষয়টি কেবল বাংলাদেশ নতুন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যোগ দিচ্ছে কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন সম্ভাবনার বিষয়টি কিভাবে এ অঞ্চলে তাদের কৌশলগত চাল বা পদপে নেয়ার পরিসরকে প্রভাবিত করতে পারে, সেটিই আসল বিষয়। 
সাবেক কূটনীতিক কবিরের মতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা হোক কিংবা অধ্যাপক হোসেনের মতে প্রতিরা সমতার ঘাটতি পূরণ করা হোকÑ উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের প্রতিরা সমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা যখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন সেই সমতা কিভাবে গড়ে তোলা উচিত এবং বাস্তবসম্মতভাবে কতটা নির্ভরতা কমানো সম্ভব?