ঢাকার ৬ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়ে অন্যদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার ছয় হাসপাতালেই ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসাধীন আছেন ৪৩০ জন। এগুলো অবশ্য বড় হাসপাতাল, এদের রোগী ভর্তির সামর্থ্য বেশি। তারপরও হঠাৎ বর্ধিতহারে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি করায় মেডিসিন বিভাগের অন্য রোগীদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে হওয়া ডেঙ্গুরোগীরা দাবিও রাখে স্পেশাল কেয়ারের। কারণ, জটিলতা নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। সে কারণে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য স্পেশাল চিকিসৎসকই নিয়োগ দেন। ডেঙ্গু ওয়ার্ড নামে আলাদা ওয়ার্ড খুলে রেখেছেন। ফলে মেডিসিন বিভাগের অন্য রোগী সেবা ব্যাহত হচ্ছে বর্ধিত ডেঙ্গুরোগীদের সেবা দিতে গিয়ে।
রাজধানীর সোহরায়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল সবচেয়ে বেশি ১৫৪ জন গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিল। এরপরই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ১০৫ জন, মুগদা মেডিক্যালে ৪৯ জন, কুর্মিটোলায় ৪৩ জন, ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪২ জন, কুয়েতমৈত্রী হাসপাতালে ১৩ জন চিকিৎসাধীন আছেন। আর বাকি ১০ হাসপাতালে ৩৩ জন চিকিৎসাধীন আছেন।  
ঢামেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে কর্মরত একজন চিকিৎসক নয়া দিগন্তকে জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডেই তাকে থাকতে হচ্ছে, ডেঙ্গু রোগীদেরই দেখতে হচ্ছে। মিডিয়ার নজর অনেক বেশি বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডেঙ্গু রোগীদের প্রতি নজর বেশি। সে কারণে মেডিসিন বিভাগের অন্য রোগীদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ওই চিকিৎসক বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের একধরনের মেন্টাল সেটআপ থাকার কারণে তারাও চিকিৎসকদের নানাভাবে প্রভাব বিস্তারে চেষ্টা করেন। মাঝেমধ্যে বড় কাউকে নিয়ে এসে অথবা ফোন করিয়ে চিকিৎসকদের সেই আগের মেন্টাল সেটআপে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেন। সরকারি হাসপাতালে এটা বেশি করতে না পারলেও বেসরকারি হাসপাতালে অনেক সময় রোগীরা এটা করে থাকেন। ওই চিকিৎসক জানান, রোগীরা অথবা রোগীর অভিভাবকরা মনে করেন, ডেঙ্গু জটিল হলেই রক্তের সাদা অংশ বা প্লাটিলেট দিতে হবে। চিকিৎসকরা কেন দেন না’ তা জানতে নেতারা চলে আসেন এবং চিকিৎসকের কাছে অবহেলার অভিযোগ করেন। ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ওই চিকিৎসক বলেন, ডেঙ্গু রোগের নতুন নতুন অনেক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। সব কিছু তো রোগীর জানার কথা না। রোগীরা মনে করেন, ডেঙ্গু হলেই প্লাটিলেট কমে যায়, আর রক্তের প্লাটিলেট আলাদা করে দিলেই বুঝি রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে। ওই চিকিৎসক বলেন, প্লাটিলেট কমে যাওয়া এখন বড় সমস্যা নয়, বড় সমস্যা হচ্ছে রক্তের মধ্যে থাকা জলীয় অংশ কমে যাওয়া। কোন অংশ কতটুকু কমে যায় সেটা জেনে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারলে দ্রুত ডেঙ্গুর জটিলতা থেকে মুক্তি পায় রোগী।
এ দিকে ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের চারজনই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং একজন মারা গেছেন রংপুর বিভাগের হাসপাতালে। মৃতদের দু’জন পুরুষ এবং বাকিরা নারী। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত মারা গেছেন এবং একই সময়ে  দেশে ৫৮ হাজার ৪০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৪৮৪ জন। তাদের মধ্যে ৬২৪ জনই ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ৯২ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।  
সারা দেশে ডেঙ্গুতে যে ১৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে সেখানে কেবল ঢাকা বিভাগে ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে ৫১ জন, উত্তর সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে ২৩ জন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপর দিকে খুলনা বিভাগে মারা গেছে ৩২ জন, বরিশাল বিভাগে ১৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহীতে ৮ জন, রংপুরে চারজন ও সিলেট বিভাগে একজন মারা গেছেন ডেঙ্গু রোগে।
চট্টগ্রামে শিশুর মৃত্যু 
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সিরাজুম মনিরা (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভোগার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকালে তার মৃত্যু হয়। মনিরা সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার নুরুন্নবীর মেয়ে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক দিন ধরে তীব্র জ্বরসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল মনিরা। মঙ্গলবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে সীতাকুণ্ড পৌরসদরের মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেয়া হয়। সেখানে এনএস১ পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। ওই দিনই তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার অবস্থার আরো অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মনিরা। 
কিশোরগঞ্জে আক্রান্ত ২৫ 
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ১০৯ জন রোগী ভর্তি আছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে কারো মৃত্যু হয়নি। 
সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের ১৭ সেপ্টেম্বরের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬ জন রয়েছেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ১২ জন এবং ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫ জন ভর্তি আছেন।
সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১১৭। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৯ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত কারো মৃত্যু হয়নি।