ফ্যাসিবাদী আমলে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন : আইনমন্ত্রী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

গত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সংবিধানের পে অবস্থান নেয়া চার হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।
আইনমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক আইনের শাসনের জন্য লড়াই করা প্রায় ৭০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিএনপির সাথে সম্পৃক্ত ছয় মিলিয়নের বেশি মানুষ রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব মামলার প্রায় ৯৯ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বর্তমান সরকারের সময়ের প্রসঙ্গ তুলে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, গত ছয় মাসের বেশি সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ দেখিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপরে বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছেÑ এমন কোনো অভিযোগও তারা পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সংবিধান আমাদের পথ দেখানোর মূল ভিত্তি। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৭৮৭  সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের শুরুতে লেখা হয়েছিল ‘উই, দ্য পিপল অব আমেরিকা’। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানেও লেখা হয়েছে ‘উই, দ্য পিপল অব বাংলাদেশ’। দুই সংবিধানের মধ্যে এটিকে একটি মিল হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মূল ভিত্তি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা। এর মধ্যে মতপ্রকাশ, সমাবেশ, চলাচল ও সংগঠনের স্বাধীনতাও রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও কিছু মৌলিক ভিত্তি ও কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারণার মিল রয়েছে।
মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশে আরো শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার ল্েয আইন করেছে। আইনের কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। তবে জনগণের অধিকার সুরতি রাখার ল্েযই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশন আইনে ‘ওএফসিএটি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিশনের বাছাই কমিটিতে প্রেস কাব ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিধান রাখা হয়েছে। বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে স্পিকার থাকছেন এবং বিরোধী দলের নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, সরকার সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সুশাসন বর্তমান সময়ে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। অর্থনীতি ও আইনের শাসনের েেত্র ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এসব অপরাধের বিচার সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘কোনো ব্যক্তি আমাদের ল্য নয়, আমাদের ল্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সূচনা হয়েছে ‘উই দ্য পিপল’Ñএই সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য দিয়ে। ১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মে ফিলাডেলফিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে সম্পূর্ণ মতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়। রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর কনস্টিটিউশন ডে পালিত হয়। এ দিনটি দেশটির সাংবিধানিক ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনার একটি সুযোগ তৈরি করে। 
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সাংবিধানিক চর্চার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও একটি নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। মতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আধুনিক সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মতার পৃথকীকরণ, মতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরার মতো নীতিগুলো এই সংবিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।