কেবল নজরদারি নয় বাড়াতে হবে সক্ষমতাও

আব্দুল কাইয়ুম

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার জুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে চালু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ চালিত ক্যামেরা এবং অটো ফাইন (স্বয়ংক্রিয় জরিমানা) ব্যবস্থা। সরকারের দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর এ পদপে মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। তবে বিশাল আর্থিক ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রযুক্তি মহাসড়কের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সঙ্কট ও সমতার ঘাটতি দূর করে কাক্সিক্ষত সুফল দিতে পারবে, নাকি এটি শুধুই এক বাড়তি খরচের উদ্যোগ হিসেবে থেকে যাবেÑ তা নিয়ে রয়েছে আলোচনা-পর্যালোচনা।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত মহাসড়কের ৪৯০টি পয়েন্টে মোট এক হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে এক হাজার ২০০টিরও বেশি ক্যামেরা ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে। ‘হাইওয়ে পুলিশের সমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করেছে। সোনারগাঁওয়ের মেঘনাঘাটে মূল ডাটা সেন্টারের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশের সদর দফতর, কুমিল্লা রিজিয়ন পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ কাঁচপুর, দাউদকান্দি ও বারআউলিয়া থানায় মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। 
তবে অভিযোগ রয়েছে, মহাসড়কে এক হাজার ২০০টির বেশি ক্যামেরা সক্রিয় থাকলেও স্বয়ংক্রিয় জরিমানা বা ‘অটো ফাইন’ কার্যক্রম বর্তমানে চলছে মাত্র ১৬টি ক্যামেরার মাধ্যমে। বিশাল এই অবকাঠামোর পুরোটাকে সচল না রাখতে পারলে প্রকল্পের আসল সুফল মিলবে না। অন্যদিকে এত নজরদারির পরও থেমে নেই দুর্ঘটনা। তাছাড়া বিভিন্ন সময় মূল সড়কে গাড়ি থামিয়ে ডাকাতির সংখ্যাও কম নয়। আর দ্রুতগতির প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে দূরপাল্লার বাসগুলোর মধ্যে। যাত্রীদের অভিযোগ, মোটরসাইকেল, বাস ও ট্রাকগুলো এআই ক্যামেরা দেখলেই গতি কমিয়ে দেয়। 
এই ব্যবস্থার আওতায় নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, নির্ধারিত লেন না মানা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হয়। অপরাধ শনাক্ত হওয়ার পরপরই বিআরটিএ-র ডাটাবেজ থেকে তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের ফোনে এসএমএস নোটিশ ও জরিমানার বার্তা চলে যায়, যা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা অনলাইনে পরিশোধ করা সম্ভব।
হাইওয়ে পুলিশ ও বিআরটিএর দেয়া তথ্যে দেখা যায়, অটো ফাইন চালুর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ৪৪৯টি মামলা দায়ের হয় এবং ১৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়, যার বেশির ভাগই ছিল অতিরিক্ত গতির কারণে। পরবর্তী ১৫ দিনে মোট ৩৭০টি অটো ফাইন সম্পন্ন হয়। প্রথম দিনে ৪২টি ও দ্বিতীয় দিনে ৩৫টি জরিমানা হলেও পরবর্তী দিনগুলোতে মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে আসে, যা চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা বৃদ্ধির বড় প্রমাণ বলে দাবি করে হাইওয়ে পুলিশ। শুধু ট্রাফিক আইনই নয়, অপরাধ দমনেও প্রযুক্তির সুফল মিলছেÑ এআই ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মহাসড়কে রডবোঝাই কাভার্ডভ্যান ছিনতাইসহ বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত ২৭ জন ডাকাতকে  শনাক্ত করতে সম হয়েছে পুলিশ।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইওয়ে পুলিশ মূলত সার্জেন্টভিত্তিক হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কেবল দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা ব্যতীত ডাকাতি বা বড় অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সমতা তাদের নেই। ফলে এআই প্রযুক্তি দিয়ে অপরাধী শনাক্ত করা গেলেও চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা পুলিশের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত লোকবল ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদ না থাকায় বিভিন্ন সময় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আর পুরো ব্যবস্থাকে পরিচালনা করতেও অনেক অর্থের প্রয়োজন। 
এছাড়া এআই ক্যামেরা চালুর পরও মহাসড়কের নিরাপত্তায় বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত সড়ক ব্যবস্থাপনা। মহাসড়কের দু’পাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য হাট-বাজার, শিল্পকারখানা, পেট্রলপাম্প, অনিয়ন্ত্রিত বাসস্ট্যান্ড এবং প্রচুর ফিডার রোড গাড়ি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। পর্যাপ্ত ফুটওভারব্রিজ বা আন্ডারপাসের অভাব ব্যবহৃত না হওয়া ওভারব্রিজগুলোর পাশাপাশি মহাসড়কের থ্রি-হুইলার চলাচল দুর্ঘটনার বড় কারণ। বিভিন্ন সময় সোর্সের তথ্যের  অজুহাতে মহাসড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ক্যামেরা বসিয়ে জরিমানা করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। যদি মহাসড়কের পাশে অবৈধ অবকাঠামো ও ফিডার রোডের চাপ নিয়ন্ত্রণ না করা যায় এবং হাইওয়ে পুলিশের নিজস্ব তদন্ত সমতা না বাড়ানো হয়, তবে কোটি কোটি টাকার এই এআই প্রকল্প নিরাপত্তা জোরদারের চেয়ে সরকারের বাড়তি খরচের খাতে পরিণত হতে পারে।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তিমান চাকমা নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের সফলতার সবচেয়ে বড় জায়গাটি হলোÑ বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কার আগে যে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করতো, চালকরা এখন সেই গতি অনেকটাই কমিয়ে এনেছেন। ক্যামেরাগুলো ঠিক কোন কোন পয়েন্টে বসানো আছে তা চালকরা জানেন না। এখন অধিকাংশ চালকই মহাসড়কে গাড়ি চালানোর সময় ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতি তুলতে চান না। অটো ফাইন ব্যবস্থা চালুর প্রথম দিকে প্রতিদিন গড়ে ৩০০টিরও বেশি মামলা হতো। তবে চালকরা নিজেদের সংশোধন করে নেয়ায় এবং সচেতনভাবে গাড়ি চালানোয় বর্তমানে মামলার সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।
বর্তমানে কিছুটা দুর্বলতা আছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, বাস কাউন্টারকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে এখনো এআই ক্যামেরা বসানো সম্ভব হয়নি। ফলে ওই পয়েন্টগুলোতে কিছু যানজট তৈরি হয়। তবে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে বাস কাউন্টারকেন্দ্রিক স্থানগুলোতেও এআই ক্যামেরা স্থাপন করার, যাতে সেখানকার ট্রাফিক পরিস্থিতিও দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে। যেহেতু মাঠে ম্যানুয়ালি কোনো মামলা দিতে হচ্ছে না, তাই পরিচালনাগত দিক থেকে আমাদের কোনো প্রকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। কুমিল্লা রিজিওনে আমাদের নিজস্ব একটি নিয়ন্ত্রণ ক (কন্ট্রোল রুম) থাকলেও কাঁচপুর থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত পুরো মহাসড়কে এক হাজার ৪০০ টিরও বেশি ক্যামেরা ও সার্বিক প্রযুক্তির কেন্দ্রীয় মনিটরিং পরিচালিত হয় মেঘনাঘাট কেন্দ্র থেকে। 
প্রযুক্তির ব্যবহারকে ইতিবাচক বললেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো: সাইফুন নেওয়াজ নয়া দিগন্তকে বলেন, মহাসড়কে যানবাহনের গতি বেশি থাকে এবং দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দেয়ার প্রয়োজন হয়, তাই ধাপে ধাপে এসব ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্তটি সঠিক। অতিরিক্ত গতি বা বেপরোয়া ড্রাইভিং পাওয়া গেলে পুলিশ যদি যানবাহন চিহ্নিত করে নিয়মিত মামলা দায়ের করে, তবে চালকদের মধ্যে আইনি ভয় থাকবে এবং অন্যান্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
তিনি আরো বলেন, কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সঠিক মনিটরিং করা সম্ভব হলে মহাসড়কে ডাকাতি বা অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধেও এটি ভালো ফল দেবে। তবে এই পুরো ব্যবস্থার জন্য ধাপে ধাপে প্রশিণ দিয়ে টেকনিক্যাল টিম ও দ জনবল গড়ে তুলতে হবে। প্রশিণ মূলত দু’টি জায়গায় দরকারÑ প্রথমত, এটি মনিটর ও অপারেশন করা; আর দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি নষ্ট হলে তা দ্রুত মেরামত করা। আমরা যদি শুধু প্রযুক্তি কিনে আনি এবং তা নষ্ট হওয়ার পর ফেলে রাখতে হয় কিংবা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ আসার জন্য অপো করতে হয়, তবে মেইনটেন্যান্সের জায়গাটা ঠিক থাকবে না।
সিস্টেমটি কার্যকর রাখার পরামর্শ দিয়ে এই যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, পুরো প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মহাসড়কের যে অংশগুলোতে ‘স্ট্রেট সেকশন’ (সোজা রাস্তা) রয়েছে এবং স্পিডিং বা গতি বেশি থাকে, সেগুলোতে ক্যামেরা সেট করা উচিত। পাশাপাশি মহাসড়ক সংলগ্ন বাজার এলাকা এবং যেসব চিহ্নিত স্থানে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, সেখানে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার পরিধি আস্তে আস্তে বাড়ানো উচিত, নিয়মিত ডাটা চেক করা দরকার এবং আইন ভঙ্গের েেত্র নিয়মিত মামলা দিতে হবে যাতে চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার ভয় বজায় থাকে।