
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সাথে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের পরবর্তী পদপে নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি জানেন এমন তিনটি সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এ তথ্য জানিয়েছে।
বৈঠকে মূলত যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা গুরুত্ব পেতে পারে। ট্রাম্প ও তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যুদ্ধের পরের পরিস্থিতি নিয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরির কাজ করছেন। এই পরিকল্পনা মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর চূড়ান্ত হওয়ার কথা। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও নিউ ইয়র্কে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করতে চান। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি বলে জানিয়েছেন একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা।
গত বছর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ট্রাম্প আটটি আরব ও মুসলিম দেশের নেতার সাথে বৈঠক করেছিলেন। ওই বৈঠকে তিনি তাদের কাছে গাজার জন্য তার খসড়া শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এর এক সপ্তাহ পর তিনি পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। এর কিছু দিন পরই যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তি হয়। এদিকে যেসব উপসাগরীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যুদ্ধের সময় সেসব দেশ ইরানের বড় ধরনের হামলার শিকার হয়েছে। একইসাথে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানিতে বিঘœ ঘটায় দেশগুলো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক তির মুখেও পড়েছে।
বুধবার ট্রাম্প বলেন, ‘আশা করি, আমরা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ ট্রাম্প আবারো দাবি করেন, ইরান একটি চুক্তি করতে চায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের কাছ থেকেই এ বিষয়ে জানতে পেরেছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নেতা অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করবেন। এসব দেশ হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান।
হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বৈঠকের জন্য প্রাথমিক আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে অন্য আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদেরও যুক্ত করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছে ইরান এবং চলমান এই যুদ্ধ এখন সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যুদ্ধের কোন পর্যায়ে রয়েছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আশা করি আমরা যুদ্ধের শেষ প্রান্তের দিকে রয়েছি।’ নর্থ ক্যারোলাইনায় পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তারা একটি সমঝোতা করতে চায়, আর দেখা যাক বিষয়টি কিভাবে এগোয়।’
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নাকি সরাসরি ইরানের প থেকে বার্তা পেয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, তিনি সরাসরি তাদের কাছ থেকে বার্তা পেয়েছেন। কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার উদ্যোগ এবং বৃহত্তর শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে জুন মাসে একটি সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও প্রণালীটি ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পের এই মন্তব্য এলো। ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের বিভিন্ন সরকারি ভবন, সামরিক স্থাপনা, পেণাস্ত্র অবকাঠামো এবং আকাশ প্রতিরা ব্যবস্থাকে ল্য করে বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর জবাবে অঞ্চলজুড়ে ইসরাইল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা পেণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এর পর থেকেই সঙ্ঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে শত্রুতা নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দীর্ঘ এই সঙ্ঘাতে উভয় পরে হামলায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ শেষের দিকে পৌঁছেছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেছে ইরান এবং তারা সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করে তাদের পারমাণবিক মতা কমিয়ে আনাই এই যুদ্ধের মূল ল্য।
তবে ট্রাম্পের সমঝোতা প্রস্তাব ও সামরিক জয়ের দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া। তিনি স্পষ্ট জানান, ওমান সাগর, আরব সাগর এবং উত্তর ভারত মহাসাগরে ইরানি নৌবাহিনী অবস্থান নিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের মূল উপকূল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তেহরানের অটুট সামরিক সমতার প্রমাণ। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী তাদের বাহিনী ধ্বংস হলে শত্রু উপকূলের কাছে ঘেষার সাহস পেত।
আমেরিকান চালকদের উদ্ধার অভিযান সম্পর্কিত পশ্চিমাদের প্রচারণাকে হলিউডি সিনেমার কাল্পনিক গল্প বলে আখ্যা দেন আকরামিনিয়া। একইসাথে তিনি ‘দশত-ই মহিয়ার’ এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক ব্যর্থ অভিযানের কথা তুলে ধরেন, যেখানে মার্কিনরা তাদের নিজেদেরই কিছু বিমান ও হেলিকপ্টার উড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আবার নতুন কোনো ভুল হিসেব কষে সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব হবে আরো মারাত্মক ও সর্বাত্মক। এদিকে যুদ্ধের ময়দানে নতুন সাফল্যের দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আজ সকালে কেশম দ্বীপের কাছে আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় মার্কিন বাহিনীর একটি সর্বাধুনিক এমকিউ-৯ ড্রোন ল্য করে নতুন প্রযুক্তির পেণাস্ত্র ছোড়া হয়। সম্পূর্ণ দেশীয় রাডার ও পেণাস্ত্র ব্যবস্থার সাহায্যে ড্রোনটি আকাশে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। গত জুন মাসে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি সত্ত্বেও সম্প্রতি পরিস্থিতি মোড় নিয়েছে অন্যদিকে। প্রকাশিত জাহাজ ট্র্যাকিং উপাত্ত অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক গড়ে ১৭টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করলেও গত বুধবার মাত্র তিনটি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করতে পেরেছে। ধরা পড়ার ভয়ে অনেক জাহাজ তাদের পরিচয় ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রেখে চলাচল করায় সঠিক সংখ্যা নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান জোরদার করতে বেইজিংয়ে দুই দিনের সফল সফর করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চার শান্তি নীতি (সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ভারসাম্য এবং শান্তিপূর্ণসহাবস্থান) মেনে চলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
এর পাশাপাশি সফর চলাকালেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সাথে ফোনে আলোচনা করেছেন আরাকচি। কূটনৈতিক টানাপড়েনের জেরে স্টকহোমে থাকা ইরানি দূতাবাসের এক সদস্যকে সুইডেন বহিষ্কার করায় তার কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। জবাবে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি তেহরানে অবস্থানরত এক সুইডিশ কূটনীতিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।







