ডাকসুর ১ বছরের কার্যবিবরণী প্রকাশ আটকে আছে যেসব উদ্যোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক বছর মেয়াদ পূর্তি উপলে গত এক বছরের কার্যক্রম ও জবাবদিহির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন ডাকসুর নির্বাচিত নেতারা। এতে আবাসন, পরিবহন, দতা উন্নয়ন, নারীশিার্থীদের সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক মূল্যায়ন, গবেষণা ও উচ্চশিা, খেলাধুলা, খাবার, পরিবেশ, লাইব্রেরি ও প্রশাসনিক সেবাসহ বিভিন্ন েেত্র নেয়া উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। অনুষ্ঠানে ডাকসুর অন্যান্য নির্বাচিত নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
ডাকসুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে দুই হাজার ৮৪১ কোটি টাকার হল প্রকল্প, পাঁচটি নতুন হল এবং ১০টি হলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন, চিকিৎসা, শিা, গবেষণা, দতা উন্নয়ন, ক্রীড়া ও শিার্থীদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ইশতেহার অনুযায়ী ডাকসু এক বছরে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। তবে প্রশাসন ও সরকারের অসহযোগিতার কারণে বেশ কিছু উদ্যোগ আটকে আছে।
ভিপি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর ক্যাম্পাসের সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম মতার পালাবদলের সময় কোনো মতাসীন ছাত্রসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল করতে পারেনি। ডাকসুর ২৫ জন নেতা এবং হল সংসদগুলোর নেতৃবৃন্দ সজাগ থাকার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিটও আমরা কাউকে দখল করতে দিইনি।’
আবাসন ও পরিবহন
আবাসন সঙ্কট নিরসনে পাঁচটি নতুন হল ও ১০টি হলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ছাত্রীদের  জন্য এক হাজার ৫০০ আসনের নতুন হল নির্মাণে ২৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে। একই সাথে হলগুলোতে ছারপোকা ও মশকনিধন এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হল সংস্কারের জন্য কয়েকটি হলের বাজেটও আদায় করা হয়েছে।
পরিবহন খাতে বনানীর বাস চালু, সব রুটে নিয়মিত সান্ধ্যকালীন বাস, তিনটি ছাত্রী হলের জন্য নতুন বাস এবং ঢাকা-কুমিল্লা সাপ্তাহিক বাস সার্ভিস চালুর কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে ১৯টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবহন খাতে প্রায় চার কোটি টাকা বরাদ্দ, কয়েকটি রুটে বাস বাড়ানো এবং বাস ট্র্যাকিং অ্যাপের পরীামূলক কার্যক্রম হয়েছে। তবে নিবন্ধিত রিকশা চালু এবং পুরনো যানবাহন নিলামে দিয়ে নতুন দু’টি মিনিবাস ও দু’টি মাইক্রোবাস কেনার উদ্যোগ অনুমোদনের পরও আটকে আছে।
হল, পাঠাগার ও অবকাঠামো
ডাকসুর প থেকে ১৩টি হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন ও আধুনিকায়নের কথা জানানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হল সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ডাকসু ভবনের সংস্কার এবং সেন্ট্রাল মসজিদের আধুনিকায়নের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শিার্থীদের নিয়মিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানান নেতারা। এটি এখনো বাস্তবায়নের অপোয় রয়েছে।
দতা উন্নয়ন ও আইনি সহায়তা
শিার্থীদের দতা উন্নয়নে মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনা প্রশিণে এক হাজার ১০০ জন অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া দুই হাজার ৫০০ শিার্থীকে ফার্স্ট এইড বুট ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রশিণ দেয়া হয়েছে। ইংরেজি স্পোকেন কোর্স, চাকরিমুখী প্রশিণ, ক্যারিয়ার সেমিনার, সাইবার নিরাপত্তা কর্মশালা এবং চীনা ভাষা কোর্সসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। 
এক বছরে চার শতাধিক শিার্থীকে আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে। যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের সাথে বৈঠক করে বিভিন্ন প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। 
নারীশিার্থীদের জন্য উদ্যোগ
নারীশিার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও উপস্থিতির নিয়ম শিথিলের প্রস্তাব সিন্ডিকেটে পাস হয়েছে বলে জানিয়েছে ডাকসু। পাঁচটি ছাত্রী হলে ১০ হাজার স্যানিটারি ন্যাপকিন বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
ছাত্রীদের জিমনেশিয়াম আধুনিকায়নে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় এবং ডে-কেয়ার সেন্টারের জন্য স্থান বরাদ্দের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রেস্টফিডিং রুম ও ডে-কেয়ারের জন্য বাজেট আনার কথাও জানিয়েছেন ডাকসু নেতারা।
স্বাস্থ্যসেবা
স্বাস্থ্যসেবায় ডাকসু প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে শহীদ ডা: মোস্তফা মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়নের কথা জানিয়েছে। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স, ১০টি এসি, এক্স-রে, ইসিজি, বিভিন্ন পরীার যন্ত্র ও শয্যা যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া দুটি মেডিক্যাল ক্যাম্পে প্রায় তিন হাজার শিার্থী সেবা পেয়েছেন। তিনটি ছাত্রী হলে প্রায় দুই হাজার ১০০ শিার্থীকে ডেঙ্গু, এইচপিভি ও টাইফয়েড টিকা দেয়া হয়েছে। ‘ফ্রি স্পেশালাইজড হেলথ ফেস্ট ৩৬০ক্ক’-এ প্রায় ছয় হাজার ৫০০ শিার্থীকে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার েেত্র ৩০০-এর বেশি শিার্থীকে কাউন্সেলিং কর্মশালায় যুক্ত করার কথাও জানানো হয়েছে।
শিক মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক সেবা
শিক মূল্যায়নপদ্ধতি চালুর বিষয়ে ডাকসু জানায়, তাদের প্রস্তাব এসএমটি ও একাডেমিক কাউন্সিলে পাস হয়ে সিন্ডিকেটে উত্থাপিত হয়েছে। তবে নিয়মিত দাবি জানানোর পরও প্রশাসনের গড়িমসির কারণে এটি বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন ডাকসু নেতারা।
শিার্থীদের জন্য প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপো না করে ডাকসুর উদ্যোগে ‘উট ঞবধপযবৎং’ ঊাধষঁধঃরড়হ’ নামে একটি সাইট চালুর কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ উদ্যোগ নিয়ে শিক মূল্যায়নের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া রেজিস্ট্রার ভবনের বিভিন্ন সেবা অনলাইনে আনা, শিার্থী পোর্টাল চালু, পরীার ফরম পূরণ, ফলাফল, ট্রান্সক্রিপ্ট, সনদ ও বিভিন্ন নথির আবেদন-সংক্রান্ত সেবা অনলাইনে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিার্থীদের বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার ল্েয ‘ঙহব উট’ অ্যাপের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গবেষণা, উচ্চশিা ও প্রকাশনা
গবেষণা ও উচ্চশিায় শিার্থীদের উৎসাহিত করতে গবেষণা কর্মশালা, রিসার্চ প্রপোজাল কর্মশালা, স্কলারশিপ সেমিনার, ‘ঋৎড়স উট ঃড় ঙীভড়ৎফ’, ‘ইবুড়হফ ইড়ৎফবৎং: টঝঅ’ এবং ‘ঊফঁপধঃরড়হ ঊঢচঙ-২০২৬’সহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ডাকসু সাহিত্য পত্রিকা, স্মারকগ্রন্থ, গল্প সঙ্কলন ও উপন্যাসসহ বিভিন্ন প্রকাশনার তালিকা দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা জানিয়েছে ডাকসু। রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সাথে সাাৎ ও মতবিনিময় এবং বিভিন্ন জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাবার, পরিবেশ ও খেলাধুলা
শিার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিন পরিদর্শন, খাদ্যের মান নিয়ে প্রশাসনের সাথে আলোচনা এবং বিভিন্ন স্থানে নতুন ক্যান্টিনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে টিসিবির স্বল্পমূল্যের পণ্য বিক্রি এবং হলে কম দামে খাবার সরবরাহের কিছু উদ্যোগ আটকে আছে বলে জানিয়েছে ডাকসু। পরিবেশ সংরণে টিএসসি এলাকায় ২০টি ডাস্টবিন স্থাপন, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শব্দদূষণবিরোধী কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
খেলাধুলায় আন্তঃহল ফুটবল ও ক্রিকেট, জুলাই রান, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং জিমনেশিয়াম সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তবে মাঠ সংস্কারের দুই কোটি টাকার প্রকল্প ও ডিজিটাল সার্ভের কাজ আটকে আছে বলে জানিয়েছে ডাকসু।
আটকে আছে ৩৩ উদ্যোগ
ডাকসুর প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে আটকে থাকা উদ্যোগের একটি পৃথক তালিকাও তুলে ধরা হয়েছে। ডাকসুর হিসাবে এমন উদ্যোগের সংখ্যা ৩৩টি। এর মধ্যে সব হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, এআই ও প্রোগ্রামিং প্রশিণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাব ও জব ফেয়ার আয়োজন রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পাঁচটি প্রকল্পও আটকে থাকার কথা জানিয়েছে ডাকসু। এর মধ্যে এ এফ রহমান হলের প্রবেশদ্বার, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া সংস্কার, পুকুরপাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে, লাইটিং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ রয়েছে।
ক্যাম্পাসের আটটি গেটে ট্রাফিক সহায়তা দিতে ডিএমপির সাথে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর তা স্থগিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধিত রিকশা চালুর উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ছাড়া সুফিয়া কামাল হলের ঝুঁকিপূর্ণ ফুটওভারব্রিজ ও একটি যাত্রীছাউনি অপসারণ এবং অন্য একটি যাত্রীছাউনি সংস্কারের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন ডাকসু নেতারা।
ডাকসু নেতাদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগের কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এবং কিছু সরকার পরিবর্তনের পর আটকে গেছে। প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপোয় থাকা এবং সরকার পরিবর্তনের পর স্থগিত বা বাতিল হওয়া উদ্যোগগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক বছর পর বর্তমান অবস্থান
ডাকসুর বর্তমান কমিটির নিয়মিত এক বছরের মেয়াদ ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সর্বোচ্চ আরো ৯০ দিন দায়িত্বে থাকতে পারবেন। এ সময়ে তাদের দায়িত্ব মূলত রুটিন কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে ডাকসু নেতারা দাবি করেছেন, তাদের মেয়াদে ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও এক দিনের জন্য কাস বা পরীা স্থগিত করতে হয়নি। একই সময়ে ডাকসু ভবনের সংস্কারও করা হয়েছে।