
ইসরাইলের দখলদারত্বের মধ্যে বসবাস করলেও দেশটির সরকার নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ নেই অধিকৃত পশ্চিম তীরের অধিকাংশ ফিলিস্তিনির। অথচ তাদের দৈনন্দিন জীবনের বাড়িঘর নির্মাণ, পানি সংগ্রহ ও চলাচলসহ নানা বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সেই সরকার নির্বাচনে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এ বৈষম্যকে অস্তিত্বহীন করে রাখার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন পশ্চিম তীরের জাবাল আল-বাবা এলাকার এক ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি।
জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত ছোট্ট বেদুইন জনপদ জাবাল আল-বাবায় প্রায় ৪৫০ মানুষের বসবাস। এলাকাটি অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’-এর অন্তর্ভুক্ত, যা পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা এবং সম্পূর্ণ ইসরাইলি সামরিক ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই জাহালিন গোত্রের সদস্য। ১৯৪৮ সালের নাকবার পরবর্তী সময়ে তাদের পূর্বপুরুষদের নেগেভ মরুভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল।
জনপদের প্রতিনিধি আতাল্লাহ আল-জাহালিন বলেন, “তারা আমাদের এমন কিছুর মতো বিবেচনা করে, যার কোনো অস্তিত্বই নেই। ভোট দেয়ার অধিকার নেই, এমনকি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের যে অধিকার থাকার কথা, সেগুলোও আমাদের নেই।”
তার অভিযোগ, বাড়ি, রাস্তা ও স্কুল নির্মাণের অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বারবার উচ্ছেদ ও স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের চাপের মুখে থাকতে হচ্ছে তাদের। গত কয়েক বছরে জনপদটিতে শতাধিকবার ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি, অনুমতি ছাড়া নির্মিত ফিলিস্তিনি স্থাপনা ভেঙে দেয়া হয়। তবে মানবাধিকার সংস্থা বিমকমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ‘এরিয়া সি’-তে ফিলিস্তিনিদের ভবন নির্মাণের অনুমতির ৯৯ শতাংশের বেশি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
আল-জাহালিনের অভিযোগ, তার সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য জায়গা তৈরি করতেই এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
সরকার বদলালেও নীতির পরিবর্তন নিয়ে সংশয়
ইসরাইলে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোটের সাথে বিরোধী জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। বিরোধী জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নাম আলোচনায় রয়েছে।
তবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকার পরিবর্তনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাদের। তৃণমূল পর্যায়ের ‘স্টপ দ্য ওয়াল’ প্রচারণার সমন্বয়ক জামাল জুমা বলেন, পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণের সূচনা হয়েছিল ১৯৬৭ সালের পর ইসরাইলের মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির শাসনামলে। তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে দখলদারত্বের নীতিতে পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশার কারণ কম।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ই-১’ বসতি প্রকল্প। জেরুজালেম ও মা’আলে আদুমিম বসতির মধ্যবর্তী এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ আরো বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে জাবাল আল-বাবাসহ প্রায় ১৮টি বেদুইন সম্প্রদায়ের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০২৫ সালের আগস্টে ইসরাইল ই-১ এলাকায় ৩ হাজার ৪০১টি বসতবাড়ি নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। ওই প্রকল্পের সমর্থনে কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছিলেন, এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে কার্যত শেষ করে দেবে। পরের মাসে নেতানিয়াহুও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।
অন্যদিকে, বিরোধী জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আইজেনকোট ই-১ প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তবে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের ধারণা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি তিনি।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেমের মাঠ গবেষণা পরিচালক করিম জুবরান বলেন, “গণতন্ত্র থাকতে পারে, কিন্তু শুধু ইহুদিদের জন্য।” তার মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও বিদ্যমান ব্যবস্থা টিকে থাকে এবং ইসরাইলের রাজনৈতিক কাঠামোয় ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি উপেক্ষিতই থেকে যায়।
পশ্চিম তীরকে বিচ্ছিন্ন করার আশঙ্কা
১৯৯০-এর দশকের অসলো চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘এরিয়া সি’ সরাসরি ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও পশ্চিম তীরের অন্যান্য এলাকাতেও চলাচল, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ভূখণ্ডের সীমানা নিয়ন্ত্রণে ইসরাইলের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
জামাল জুমার আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পশ্চিম তীরের শহর ও গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে পড়বে। এতে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ ও চলাচল আরো কঠিন হয়ে উঠবে।
করিম জুবরানের মতে, এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা জরুরি। বিশেষ করে ই-১ প্রকল্প বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ জোরদার করা হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
এদিকে নতুন করে উচ্ছেদের আশঙ্কার মধ্যেও জাবাল আল-বাবা ছেড়ে যেতে রাজি নন আতাল্লাহ আল-জাহালিন। তার পরিবার অতীতে নাকবা-পরবর্তী সময়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি আমার বাবার মতো জীবন কাটাতে প্রস্তুত নই। আমি একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে এখানেই থাকব—এই পৃথিবীতে বাঁচি বা মরি।”
সূত্র : আল জাজিরা
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








