হরমুজ প্রণালী-ইরান-বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা-ডব্লিউটিও
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে - ফাইল ছবি সংগৃহীত

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক নগোজি ওকনজো-ইওয়েলা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহব্যবস্থার সংকটের কারণে গত ৮০ বছরের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্য সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে পড়েছে। এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও সারের দাম বেড়ে যেতে পারে। 

তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনদোলু ১৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, জেনেভায় ডব্লিউটিওর পাবলিক ফোরামের ফাঁকে সংস্থাটির মহাপরিচালক ওকনজো-ইওয়েলা বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। তবে চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ডব্লিউটিওর ১৬৬টি সদস্যদেশের জন্য বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি জানান, ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যেও চলতি বছর পণ্যবাণিজ্য অপ্রত্যাশিতভাবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের মোট লেনদেনের ৭২ শতাংশ এখনো ডব্লিউটিওর নিয়মকানুনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।

পুরো বছরে পণ্যবাণিজ্য বৃদ্ধির প্রাথমিক পূর্বাভাস ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

ওকনজো-ইওয়েলা বলেন, এই প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের দ্রুত সম্প্রসারিত বাণিজ্য থেকে। আর এ বাণিজ্যকে এগিয়ে নিয়েছে কম বা শূন্য শুল্কের চুক্তি। এসব চুক্তির আওতায় বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও চিপের ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চালান রয়েছে।

তবে এই প্রবণতা কতটা টেকসই, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে বলেন, এই দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্যের অর্থনৈতিক সুফল মূলত উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক বাজার কতটা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্নের কারণে এখন পর্যন্ত সৃষ্ট ধাক্কা সামাল দিতে বিভিন্ন দেশের জাতীয় মজুত বাজারকে সাময়িকভাবে সুরক্ষা দিয়েছে বলে জানান ডব্লিউটিওপ্রধান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় অনিবার্যভাবে বেড়ে যাবে।

ডব্লিউটিওর আগের হিসাব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে উঠলে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে। বর্তমানে তেলের দাম সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প পথে জাহাজ ঘুরিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘ এই ঘুরপথে পরিবহন ব্যয় ও অতিরিক্ত মাশুল অনেক বেড়েছে। ফলে বর্তমান সরবরাহব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে সতর্ক করেন ওকনজো-ইওয়েলা।

ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে এমন সংকট দেখা দিলে অর্থনীতি সুরক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন সরকার জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করছে। সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এই শতাব্দীর উপযোগী বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ডব্লিউটিওর অভ্যন্তরীণ আলোচনা আরো জোরদার হয়েছে।

ওকনজো-ইওয়েলা বলেন, ন্যায্য বৈশ্বিক উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। ডব্লিউটিওর বর্তমান কাঠামো উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আধুনিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়নে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এতে এসব দেশও অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মাধ্যমে অকার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো সংশোধন করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেয়া হবে।

ডব্লিউটিওর পাবলিক ফোরাম উপলক্ষে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ভেঙে পড়লে এবং বাণিজ্যবিধি আধুনিকায়নে ব্যর্থ হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ১০ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে।