ইরাক যুদ্ধের বিভীষিকা ও এক সেনার অনুশোচনা

আলমগীর কবির, টরেন্টো, কানাডা থেকে


টরন্টোর বিকেল তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের আকাশে নরম আলো। শহরের ডাউনটাউনে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (টিফ) ঘিরে ব্যস্ততা। উৎসবের ভেনুগুলোর দিকে মানুষের যাতায়াত, হাতে উৎসবের ব্যাগ, কোথাও সিনেমার পোস্টার, কোথাও সারিবদ্ধ দর্শক। শহরের সাংস্কৃতিক ব্যস্ততার সেই আবহ পেরিয়ে রয়্যাল টমসন হলের দিকে এগোতেই বোঝা যায়, সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীগুলোর একটি সামনে। 
বিকেল সাড়ে ৫টা। রয়্যাল টমসন হলের আলো-আঁধারি মিলিয়ে দর্শকরা আসন নিচ্ছেন। ১৯৮২ সালে উদ্বোধিত এই স্থাপনাটি তার অসাধারণ ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সম্পূর্ণ গোলাকার ঢালু ছাদের এই ভবনটির বাইরে কাচের এক বিশাল গম্বুজাকৃতির ফ্রেম রয়েছে। রাতে আলো জ্বালানো হলে এটি এক অপূর্ব নান্দনিক রূপ নেয়। ‘টরন্টো সিমফনি অর্কেস্ট্রে’র মূল কেন্দ্র এটি। প্রায় দুই হাজার ৬৩০টি আসনবিশিষ্ট এই হলের ভেতরের শব্দ ব্যবস্থা (সাউন্ড অ্যাকোস্টিকস) বিশ্বমানের, যা সিনেমা প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। 
পর্দায় শুরু হলো রিড ভ্যান ডাইকের ‘অ্যাটোনমেন্ট’ (অনুতাপ)। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই টরন্টোর একটি ঝকঝকে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা দর্শককে নিয়ে গেল ২০০৩  সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাগদাদে। যেখানে একটি পরিবার জানত না, আর মাত্র কিছুক্ষণ পর তাদের জীবনের সব কিছু বদলে যাবে। 
সেই প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতাটি ছিল অন্যরকম। কারণ ‘অ্যাটোনমেন্ট’ শুরু হয় কোনো যুদ্ধের প্রচলিত দৃশ্য দিয়ে নয়; শুরু হয় মানুষ দিয়ে। একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, ঘরের ভেতরের কথাবার্তা, টেলিভিশনের সামনে বসা, আত্মীয়দের সাথে সময় কাটানো সব কিছুর মধ্য দিয়ে। বাইরে যুদ্ধ চলছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে মানুষ তখনো জীবনকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। 
এই স্বাভাবিকতার ওপরই হঠাৎ আছড়ে পড়ে যুদ্ধ। কাছাকাছি একটি বিস্ফোরণের পর পরিবারের সদস্যরা গাড়িতে করে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। বাগদাদের একটি মোড়ে মার্কিন সেনাদের সাথে তাদের গাড়ির মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেনারা তাদের বিদ্রোহী বা শত্রুপক্ষের সদস্য বলে ভুল করে গুলি চালায়। কয়েক মুহূর্তের গোলাগুলিতে মরিয়মের স্বামী ও দুই ছেলে নিহত হন। তার মেয়ে নোরাও আহত হয়। 
রয়্যাল টমসন হলের বড় পর্দায় সেই দৃশ্য যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন যুদ্ধের বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল একটি পরিবারের বিপর্যয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস এখানে কোনো দূরের ভূরাজনৈতিক অধ্যায় নয়; সেটি হয়ে উঠছিল একটি মায়ের ব্যক্তিগত শোক, একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া এবং একজন তরুণ সেনার জীবনের বোঝা। 
চলচ্চিত্রটির গল্প এখানেই থেমে থাকে না; বরং সময়ের সাথে সাথে আরো জটিল হয়ে ওঠে। 
এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। লু-বয়েড হলব্রুকের অভিনীত মার্কিন সেনা, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু যুদ্ধ তার ভেতর থেকে ফিরে যায়নি। অপরাধবোধ, মানসিক যন্ত্রণা ও মাদকাসক্তি তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে। শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনী থেকেও তাকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়। 
তারপর এক দিন পুরনো একটি সংবাদ প্রতিবেদন তার হাতে আসে। সাংবাদিক মাইকেল যে প্রতিবেদনটি করেছিলেন, সেখানে সেই ইরাকি পরিবারের কথা রয়েছে। মাইকেল চরিত্রে অভিনয় করেছেন কেনেথ ব্রানাঘ। লু এবার সেই সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করে। তার একটাই অনুরোধ, ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসা পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের সাথে তার দেখা করিয়ে দিতে হবে। কেন? ক্ষমা পাওয়ার জন্য? নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য? নাকি বহু বছর ধরে নিজের মধ্যে বহন করা সেই ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার জন্য? 
‘অ্যাটোনমেন্ট’ এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর দেয় না। টরন্টোতে প্রিমিয়ারের পর রয়্যাল টমসন হলের পরিবেশও যেন চলচ্চিত্রটির আবহ থেকে খুব দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারেনি। প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর মঞ্চে আসেন পরিচালক রিড ভ্যান ডাইক এবং অভিনয়শিল্পী কেনেথ ব্রানাঘ, বয়েড হলব্রুক ও হিয়াম আব্বাস। দর্শকদের সামনে তাদের সাথে কথোপকথন শুরু করেন টিফের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি। 
সিনেমা হলের আলো জ্বলে উঠলেও আলোচনার বিষয় রয়ে যায় সেই অন্ধকার; যুদ্ধের অন্ধকার, মানুষের ভুলের অন্ধকার এবং তার পরিণতির অন্ধকার। 
পরিচালক রিড ভ্যান ডাইক জানান, ২০১২ সালে সাংবাদিক ডেক্সটার ফিলকিন্সের একটি লেখা পড়ে তিনি প্রথম এই গল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন। তখন তিনি কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলেন এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবছিলেন। ফিলকিন্সের ১২ পৃষ্ঠার নন-ফিকশন লেখাটি তার মনে থেকে যায়। 
সেই লেখা থেকে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করা সহজ ছিল না। কিন্তু ভ্যান ডাইকের কাছে গল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইরাকি বেসামরিক মানুষের দৃষ্টিকোণ। পশ্চিমা যুদ্ধের চলচ্চিত্রে ইরাককে অনেক সময় যুদ্ধ, বিস্ফোরণ ও সামরিক অভিযানের পটভূমি হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনি চেয়েছেন তার বাইরে গিয়ে ইরাকিদের মানুষ হিসেবে দেখাতে- তাদের পরিবার আছে, দৈনন্দিন জীবন আছে, স্বপ্ন আছে, ভয় আছে। 
এ কারণেই ‘অ্যাটোনমেন্ট’-এর শুরুটা এত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই দর্শক পরিবারটির সাথে পরিচিত হয়ে যায়। ফলে গুলির মুহূর্তে তারা শুধু ‘যুদ্ধের শিকার’ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে পরিচিত মানুষ। 
ভ্যান ডাইক আরো বলেন, ইরাক যুদ্ধ নিয়ে তৈরি অনেক চলচ্চিত্রে ভালো ও মন্দের একটি সরল বিভাজন থাকে। কিন্তু ‘অ্যাটোনমেন্ট’-এ তিনি সেই সহজ কাঠামো এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। তার গল্পে সঙ্ঘাত আছে, অপরাধ আছে, ভয়াবহ ক্ষতি আছে কিন্তু একমাত্রিক খলনায়ক নেই; বরং তিনটি চরিত্রই তাদের নিজ নিজ নৈতিক জটিলতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। 
মাইকেল চরিত্রের প্রস্তুতি নিতে কেনেথ ব্রানাঘ বাস্তব সাংবাদিক ডেক্সটার ফিলকিন্সের সঙ্গে কথা বলেন। ব্রানাঘ জানান, তিনি জানতে চেয়েছিলেন ফিলকিন্স কিভাবে রিপোর্ট করতেন, কিভাবে ভ্রমণ করতেন, এমনকি কী ধরনের নোটবুক ব্যবহার করতেন; কলম না পেনসিল, নোটবুকটি নরম না শক্ত; এসবও।
এই ছোট ছোট তথ্যের মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিক চরিত্রটির বাস্তবতা ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ফিলকিন্সের মানসিক অভিজ্ঞতা বোঝা। একটি ঘটনা প্রথমে যতটা সরল মনে হয়েছিল, রিপোর্ট করতে গিয়ে সেটিই ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে। আর সেই জটিলতার কেন্দ্রে চলে আসে ক্ষমার প্রশ্ন। 
ক্ষমা কি সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়, তাহলে কি ভুলে যাওয়া জরুরি? ব্রানাঘের কথায়, চরিত্রটির কাছে এই প্রশ্নগুলোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 
বয়েড হলব্রুকের জন্য লু ছিল আরো কঠিন এক যাত্রা। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সৈনিককে অনেক সময় মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে সেই সিদ্ধান্তের নৈতিক মূল্যায়ন শুরু হয় অন্যভাবে।
হলব্রুক বলেন, যেসব পুরুষ ও নারী দেশের হয়ে যুদ্ধে যান, তাদের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ‘ফগ অব ওয়ার’ বা যুদ্ধের বিভ্রান্তির মধ্যে নেয়া সিদ্ধান্ত যখন মানুষকে বাড়ি ফিরে অনুসরণ করে, তখন তার সাথে বেঁচে থাকা কতটা কঠিন লু চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেটিই তিনি অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন। 
তার চরিত্র যুদ্ধক্ষেত্রে একধরনের নিশ্চিততা নিয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু দেশে ফিরে সেই নিশ্চিয়তা ভেঙে যায়। একসময় যে সিদ্ধান্তকে যুদ্ধের প্রয়োজন মনে হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী জীবনে তার কাছে অপরাধের স্মৃতি হয়ে দাঁড়ায়। আর এই জায়গায় এসে ‘অ্যাটোনমেন্ট’ কেবল ইরাক যুদ্ধের চলচ্চিত্র থাকে না। এটি হয়ে ওঠে যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষের নিজের সাথে নিজের লড়াইয়ের গল্প। 
মরিয়ম চরিত্রে হিয়াম আব্বাসের অভিনয় প্রিমিয়ারে বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। তার চরিত্রের যন্ত্রণা অনেক সময় কোনো সংলাপ ছাড়াই প্রকাশ পায়। মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের স্থিরতা, নীরবতা সব মিলিয়ে একজন মায়ের হারানোর গভীরতা পর্দায় তৈরি হয়। 
আলোচনায় আব্বাসকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, কিভাবে তিনি শব্দের বাইরে গিয়ে মরিয়মের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন, তার উত্তর ছিল খুব সরল তিনি জানেন না। 
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এমন গভীর ও জটিল একটি গল্পে তিনটি চরিত্রের জীবন যখন পরস্পরের সাথে জড়িয়ে থাকে, তখন অভিনয় কোনো হিসাব করে করা বিষয় নয়। চিত্রনাট্য, পরিচালকের নির্দেশনা এবং অভিনেতার শরীর-মন সব কিছু মিলেই মুহূর্তটি তৈরি হয়। 
আব্বাস আরো বলেন, চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষের জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় তাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্পটি বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি দায়িত্ব তিনি অনুভব করেছেন। শিল্পীরা এমন গল্প বারবার সামনে আনবেন যাতে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এমন ট্র্যাজেডিগুলো নিয়ে প্রশ্ন থেমে না যায়। 
রয়্যাল টমসন হলের সেই আলোচনায় আরেকটি প্রশ্ন ছিল বর্তমান আমেরিকার দিকে তাকিয়ে। ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার ২৩ বছর পর, যুদ্ধের অনেক প্রবীণ সৈনিক দীর্ঘদিন ধরে দেশে ফিরে যাওয়ার পর, যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্রটি কিভাবে গ্রহণ করা হবে? 
ভ্যান ডাইকের উত্তর, তিনি জানেন না। তবে চলচ্চিত্রটি বানাতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, একটি নির্দিষ্ট দিনে ঘটে যাওয়া একটি ছোট ঘটনা কিভাবে বহু মানুষের জীবনকে বছরের পর বছর ধরে প্রভাবিত করতে পারে। শুধু বোমা পড়ার সময় নয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও সেই অভিঘাত থেকে যায়।
আরো একটি বিষয় তাকে নাড়া দিয়েছে। ‘অ্যাটোনমেন্ট’ লেখার পর থেকে বিশ্ব বদলেছে। চলচ্চিত্রটি সম্পাদনার সময় প্রতিদিনের সংবাদ, নতুন নতুন সঙ্ঘাত এবং বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাকে পুরনো গল্পটিকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করেছে। 
এসব কথা বলার সময় রয়্যাল টমসন হলের আলোচনাটি কেবল একটি নতুন সিনেমার প্রচারণামূলক আয়োজন বলে মনে হচ্ছিল না; বরং মনে হচ্ছিল, টরন্টোর একটি সিনেমা হল থেকে ২০০৩ সালের বাগদাদের দিকে ফিরে তাকানো হচ্ছে; এবং সেই ফিরে তাকানোর মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ, সঙ্ঘাত ও মানুষের ওপর তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন করা হচ্ছে। 
‘অ্যাটোনমেন্ট’-এর আন্তর্জাতিক সমালোচনাতেও এই দ্বৈততা উঠে এসেছে। চলচ্চিত্রটির প্রথম অংশে ইরাকি পরিবারের জীবনকে যুদ্ধের প্রচলিত আমেরিকান দৃষ্টিকোণের বাইরে দেখানোর প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করা হয়েছে। তবে পরবর্তী অংশে এসে গল্পের তিনটি দৃষ্টিকোণকে এক জায়গায় নিয়ে আসার কাঠামো সব সময় পুরোপুরি সফল হয়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে লু-র অপরাধবোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়ায় মরিয়মের দৃষ্টিকোণ কিছু জায়গায় আড়ালে পড়ে গেছে এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে। 
তবু ‘অ্যাটোনমেন্ট’ যে প্রশ্নটি সামনে আনে, তা সহজে শেষ হয় না। একটি ভুল সিদ্ধান্ত কি একটি পরিবারের বহু বছরের শোকের কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে? অপরাধবোধ কি নিহত মানুষদের ফিরিয়ে দিতে পারে? আর একজন অপরাধী সত্যিই অনুতপ্ত হলে তার অনুশোচনার ভার কি ভুক্তভোগীকেই বহন করতে হবে? 
১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোর রয়্যাল টমসন হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসব প্রশ্নই যেন চলচ্চিত্রটির সাথে থেকে যাচ্ছিল। বাইরে তখন টরন্টোর রাত নামছে। উৎসবের ব্যস্ততা চলছে, শহরের রাস্তায় আলো জ্বলছে, দর্শকরা এক প্রদর্শনী থেকে আরেক প্রদর্শনীর দিকে ছুটছেন। সিনেমার পর্দার বাগদাদ আর বাইরে উৎসবমুখর টরন্টো দুই ভিন্ন সময় ও বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। 
কিন্তু ‘অ্যাটোনমেন্ট’ মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের সময় ও যুদ্ধের পরের সময়ের মধ্যে মানুষের জীবনে সব সময় তেমন স্পষ্ট সীমারেখা থাকে না।
যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে। সৈনিক বাড়ি ফিরতে পারে। পরিবার অন্য দেশে চলে যেতে পারে। সাংবাদিক তার প্রতিবেদন লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু একটি গুলির অভিঘাত, একজন মায়ের শোক কিংবা একজন সৈনিকের অপরাধবোধ- এসবের কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ থাকে না। ‘অ্যাটোনমেন্ট’ সেই অসমাপ্ত হিসাবের গল্পই বলে।
চলচ্চিত্রটি যুক্তরাষ্ট্রে ২ অক্টোবর থেকে কিনো লর্বারের পরিবেশনায় মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এটি রিড ভ্যান ডাইকের অভিষেক। এর আগে তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ডিক্যাব এলিমেন্টারি’ অস্কারে মনোনীত হয়েছিল।
টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের পর ‘অ্যাটোনমেন্ট’ এখন বৃহত্তর দর্শকের সামনে যাওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বরের সেই সন্ধ্যায় রয়্যাল টমসন হলে বিশ্ব প্রিমিয়ারের মুহূর্তে চলচ্চিত্রটি যে প্রশ্নটি রেখে গেছে, তার উত্তর সিনেমা হলের পর্দায় পাওয়া যায়নি; ক্ষমা কি সত্যিই অতীতের ক্ষত মুছে দিতে পারে, নাকি কিছু যুদ্ধ মানুষের ভেতরে আজীবন চলতেই থাকে?