ভোলার গ্যাস আনতে মাইক্রো এলএনজি প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে
ভোলার গ্যাস আনতে মাইক্রো এলএনজি প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে


ইউনিভার্সিটি ব্রুনেই দারুসসালামের পেট্রোলিয়াম জিওলজি অ্যান্ড জিওফিজিক্স বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, দেশে তীব্র গ্যাসসঙ্কটের মধ্যেও আবিষ্কৃত গ্যাস শুধু অবকাঠামোর অভাবে আটকে থাকতে পারে না। ভোলার গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাইক্রো এলএনজি প্রযুক্তিটি বিশ্বে পরীক্ষিত এবং ভোলায় আলোচিত গ্যাসের পরিমাণও আশাব্যঞ্জক। এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, আবার অবাস্তব ধারণাও নয়। এখন প্রয়োজন স্লোগান নয়; নির্ভরযোগ্য রিজার্ভ ও উৎপাদন তথ্য, বাস্তব পরিবহন সমীক্ষা, নিশ্চিত ক্রেতা, স্বচ্ছ দরপত্র এবং সমমানের ভিত্তিতে এলএনজি, সিএনজি ও পাইপলাইনের তুলনা। 
ড. আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রশ্ন হলো- এক দিকে দেশে গ্যাসের জন্য হাহাকার, অন্য দিকে আবিষ্কৃত ও উৎপাদনযোগ্য গ্যাস শুধু পাইপলাইনের অভাবে কেন আটকে থাকবে? স্থায়ী পাইপলাইন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে। কিন্তু পাইপলাইন নির্মাণে সময়, বড় বিনিয়োগ, নদী পারাপার, ভূমি অধিগ্রহণ ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। এই অপেক্ষার সময়ে মাইক্রো এলএনজি বা স্মল-স্কেল এলএনজি একটি সম্ভাব্য ‘সেতু ব্যবস্থা’ হতে পারে। 
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে  ড. আমিন এসব কথা বলেন। এটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের সিটি এডিটর আশরাফুল ইসলাম। তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো- 
প্রশ্ন : দেশে তীব্র গ্যাসসঙ্কট চলছে; অথচ ভোলার মতো এলাকায় গ্যাস আবিষ্কৃত ও উৎপাদনযোগ্য থাকা সত্ত্বেও পাইপলাইনের অভাবে তা বড় বাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে না। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন? 
ড. আমিনুল ইসলাম : এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় বৈপরীত্য। এক দিকে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য গ্রাহক গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছে; অন্য দিকে দেশের কিছু এলাকায় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ভোলা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। স্থায়ী পাইপলাইন অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। কিন্তু পাইপলাইন নির্মাণে সময়, বড় বিনিয়োগ, নদী পারাপার, ভূমি অধিগ্রহণ এবং অনুমোদনের মতো বিষয় রয়েছে। ফলে পাইপলাইন না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসকে পড়ে থাকতে দেয়া অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়। 
এই মধ্যবর্তী সময়ে মাইক্রো বা স্মল-স্কেল এলএনজি একটি ‘ভার্চুয়াল পাইপলাইন’ হিসেবে কাজ করতে পারে। 
প্রশ্ন : মাইক্রো এলএনজি প্ল্যান্ট আসলে কিভাবে কাজ করে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : ধারণাটি তুলনামূলক সহজ। গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাস প্রথমে প্রক্রিয়াজাত করে পানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার যৌগ, পারদ এবং ভারী হাইড্রোকার্বনের মতো অনাকাক্সিক্ষত উপাদান সরিয়ে নিতে হয়। এরপর একটি ছোট ও মডুলার লিকুইফ্যাকশন প্ল্যান্টে গ্যাসকে প্রায় মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠাণ্ডা করে তরল এলএনজিতে রূপান্তর করা হয়। 
তরল অবস্থায় গ্যাসের আয়তন স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় প্রায় ৬০০ ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। ফলে একটি ক্রায়োজেনিক ট্যাংকারে তুলনামূলক বেশি পরিমাণ গ্যাসের সমপরিমাণ শক্তি বহন করা সম্ভব। এরপর বিশেষ ক্রায়োজেনিক ট্যাংকার বা আইএসও কনটেইনারে করে এলএনজি সড়ক, ফেরি বা বার্জের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে নেয়া যায়। গন্তব্যে ছোট স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন স্টেশনে আবার এটিকে গ্যাসে রূপান্তর করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থা বা জাতীয় গ্রিডের কোনো সংযোগিন্দুতে সরবরাহ করা যায়; অর্থাৎ পাইপলাইন না থাকলেও ট্যাংকারের মাধ্যমে একটি ‘ভার্চুয়াল পাইপলাইন’ তৈরি করা সম্ভব। 
প্রশ্ন : ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে পরিবহনের উদ্যোগও হয়েছে। তাহলে এলএনজি প্ল্যান্টের প্রয়োজন কেন? 
ড. আমিনুল ইসলাম : স্বল্প দূরত্ব ও তুলনামূলক কম পরিমাণ গ্যাসের ক্ষেত্রে সিএনজি একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা। এর প্ল্যান্ট তুলনামূলক সহজ এবং প্রাথমিক বিনিয়োগও কম। কিন্তু গ্যাসের পরিমাণ ও পরিবহন দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে সিএনজি পরিবহনে প্রতিটি গাড়ির বহনক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেশি গাড়ি, বেশি চালক, বেশি লোডিং-আনলোডিং ও ফেরিঘাটে অপেক্ষা- সব মিলিয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 
মাইক্রো এলএনজি প্ল্যান্টে গ্যাস শোধন ও তরল করার ব্যবস্থা বেশি জটিল এবং শক্তি খরচও বেশি। কিন্তু একটি ক্রায়োজেনিক ট্যাংকারে অনেক বেশি পরিমাণ শক্তি বহন করা যায়। তাই মাঝারি পরিমাণ গ্যাস, দীর্ঘ পথ ও ফেরিনির্ভর রুটে এলএনজি প্ল্যান্টভিত্তিক ব্যবস্থা সিএনজির চেয়ে কার্যকর হতে পারে। তবে এটি অনুমানের ভিত্তিতে বলা যাবে না। একই গ্যাস মূল্য, একই গ্রাহক স্থান, একই দূরত্ব ও একই আর্থিক শর্ত ধরে সিএনজি ও এলএনজির প্রকৃত সরবরাহ ব্যয় তুলনা করতে হবে। 
প্রশ্ন : ভোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গ্যাসের পরিমাণ কি মাইক্রো এলএনজি প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট? 
ড. আমিনুল ইসলাম : মাইক্রো এলএনজি প্ল্যান্টের জন্য বিশ্বব্যাপী কোনো একক সর্বনিম্ন সীমা নেই। দৈনিক ১ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচেও প্রযুক্তিগতভাবে প্ল্যান্ট চালানো সম্ভব; কিন্তু সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে তা কঠিন। 
দৈনিক ৩ থেকে ১০ মিলিয়ন ঘনফুটকে মিনি বা মাইক্রো এলএনজি প্ল্যান্টের পরিচিত বাণিজ্যিক পরিসর হিসেবে ধরা যায়। ১০ মিলিয়ন ঘনফুটের ওপরে গেলে সাধারণত আকারজনিত ব্যয় সুবিধা বাড়ে; যদি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে এবং ক্রেতা নিয়মিত গ্যাস নেয়। 
ভোলা থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আকারে আনার যে আলোচনা হয়েছে, তা খুব ছোট মাইক্রো প্রকল্প নয়; বরং এটি স্মল-স্কেল এলএনজি প্ল্যান্টের উপযোগী পরিমাণ। 
প্রশ্ন : দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থেকে কত এলএনজি পাওয়া যেতে পারে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : আনুমানিক হিসাবে এই গ্যাস থেকে দিনে প্রায় ৬০০ টন এলএনজি তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত উৎপাদন গ্যাসের উপাদান, প্ল্যান্টের নিজস্ব জ্বালানি ব্যবহার এবং রিকভারি রেটের ওপর নির্ভর করবে। 
১৮ থেকে ২৪ টন ধারণক্ষমতার ট্যাংকার ব্যবহার করলে প্রতিদিন আনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫টি লোডেড ট্রিপ প্রয়োজন হতে পারে। তাই ফেরিঘাট, রাস্তা, সেতুর ধারণক্ষমতা, ট্যাংকারের ঘুরে আসার সময় এবং দুর্যোগকালে বিকল্প ব্যবস্থা- সব কিছুর বাস্তব সমীক্ষা অপরিহার্য। 
প্রশ্ন : বিশ্বের কোথাও এ ধরনের মডেল বাস্তবে ব্যবহার হচ্ছে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : এটি কোনো কাগুজে বা পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ ভারত। ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রির দু’টি স্থান এবং গুজরাটের আঙ্কলেশ্বর ও ক্যাম্বে এবং ঝাড়খন্ডের বোকারোতে আটকে থাকা গ্যাস ব্যবহারের জন্য মিনি এলএনজি প্ল্যান্টের উদ্যোগ নিয়েছে। 
পরিকল্পনাটি হলো কূপের কাছাকাছি গ্যাস তরল করা, ক্রায়োজেনিক ট্যাংকারে বহন করা এবং পাইপলাইন বা গ্রাহকের কাছে আবার গ্যাসে রূপান্তর করা। একটি আলোচিত প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ হাজার স্ট্যান্ডার্ড ঘনমিটার ফিড গ্যাস থেকে ৩২ থেকে ৩৫ টন এলএনজি উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। 
চীন ছোট ও মাঝারি এলএনজি প্ল্যান্ট এবং সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। নরওয়েতে দূরবর্তী শিল্প ও সামুদ্রিক খাতে স্মল-স্কেল এলএনজি ব্যবহৃত হয়েছে। পেরুতে পাইপলাইনের বাইরের শহর ও শিল্পাঞ্চলে ভার্চুয়াল পাইপলাইনের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের অভিজ্ঞতা রয়েছে। 
তবে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপভিত্তিক অভিজ্ঞতা একটি সতর্কবার্তাও দেয়- পরিবহন ব্যবস্থা জটিল হলে এবং প্ল্যান্ট বা রিসিভিং টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় না চললে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। 
প্রশ্ন : বেসরকারি খাতকে কি এই প্রকল্পে যুক্ত করা সম্ভব? 
ড. আমিনুল ইসলাম : অবশ্যই। জাতীয় গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রতিটি প্ল্যান্ট ও প্রতিটি ট্যাংকারের মালিক হতে হবে এমন নয়। উৎপাদক নির্ধারিত মানের গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, আর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্ল্যান্ট নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও পরিবহনের দায়িত্ব নিতে পারে। 
তবে মূল্য, নিরাপত্তা, সরবরাহের নিশ্চয়তা, সম্পদের মালিকানা এবং চুক্তির মেয়াদ- সব কিছু স্বচ্ছ হতে হবে। দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অস্বচ্ছ বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল চুক্তি করা যাবে না। 
প্রশ্ন : এ ধরনের প্রকল্পে আনুমানিক কত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : প্রকাশিত আন্তর্জাতিক তথ্য অনুসারে প্রাথমিক স্ক্রিনিং রেঞ্জ হিসেবে দৈনিক ১ থেকে ৩ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার প্ল্যান্টে মোট প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৮ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন ঘনফুটের প্ল্যান্টে প্রায় ২০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার এবং দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের একটি পূর্ণ ব্যবস্থায় প্রায় ৬০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। 
তবে এগুলো ভোলার প্রকল্পের নির্দিষ্ট বাজেট নয়। পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া নির্ভরযোগ্য ব্যয় বলা সম্ভব নয়। 
প্রশ্ন : শুধু প্ল্যান্টের দাম দেখেই কি প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যাবে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : না। প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে থাকবে গ্যাস সংগ্রহ, কম্প্রেশন, গ্যাস ট্রিটমেন্ট, লিকুইফ্যাকশন, বিদ্যুৎ, স্টোরেজ, লোডিং ব্যবস্থা, ট্যাংকার বহর, ফেরি বা বার্জ, গ্রহণকেন্দ্র, রিগ্যাসিফিকেশন, গ্রাহক সংযোগ, অগ্নি নিরাপত্তা, কর, অর্থায়ন ও পরিচালন ব্যয়। তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- ভোলার কূপ থেকে গ্রাহকের দরজায় প্রতি ঘনমিটার বা প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাস পৌঁছাতে মোট কত খরচ হচ্ছে? এই ‘ডেলিভারড কস্ট’-ই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত। 
প্রশ্ন : একটি মাইক্রো এলএনজি প্রকল্প বাস্তবে চালু করতে কত সময় লাগতে পারে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : এটি রাতারাতি সমাধান নয়। পরিকল্পনা, দরপত্র, অনুমোদন, যন্ত্রপাতি তৈরি ও সরবরাহ, সাইট প্রস্তুতি এবং কমিশনিং- সব মিলিয়ে একটি মানসম্মত মডুলার প্রকল্প বাস্তবসম্মতভাবে ১২ থেকে ১৮ মাসে চালু হতে পারে। বিশেষভাবে নকশা করা বা জটিল প্রকল্পে ১৮ থেকে ২৪ মাসও লাগতে পারে। 
তবে বহু বছরের পাইপলাইন নির্মাণের অপেক্ষার তুলনায় এটি দ্রুত। সরকার এখন উদ্যোগ নিলে একটি পাইলট প্রকল্প অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ে চালু করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। 
প্রশ্ন : সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভোলার গ্যাস সম্পর্কে কোন বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে হবে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে কতটুকু গ্যাস সত্যিই উত্তোলনযোগ্য, কূপগুলো কত বছর স্থিতিশীল উৎপাদন দিতে পারবে এবং সম্ভাব্য উৎপাদন প্রোফাইল কী। এরপর গ্যাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড, পানি, সালফার, পারদ ও ভারী হাইড্রোকার্বনের পরিমাণ জানতে হবে। এসব তথ্য প্ল্যান্টের নকশা, গ্যাস ট্রিটমেন্ট ও বিনিয়োগ ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া প্ল্যান্টের নিজস্ব বিদ্যুৎ ও গ্যাস খরচ, বছরে কার্যকরভাবে কত দিন চলবে, ট্যাংকারের যাতায়াত চক্র কত ঘণ্টা এবং ধর্মঘট, ঘূর্ণিঝড় বা ফেরি বন্ধ হলে কত দিনের স্টোরেজ থাকবে- এসবও হিসাব করতে হবে। 
প্রশ্ন : সম্ভাব্য বাজার বা ক্রেতার বিষয়টি কিভাবে নিশ্চিত করা উচিত? 
ড. আমিনুল ইসলাম : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের আগ্রহপত্রকে নিশ্চিত চাহিদা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। আগ্রহপত্র আর নিশ্চিত গ্যাস চাহিদা এক জিনিস নয়। 
শিল্প গ্রাহক বা গ্রিড অপারেটরের সাথে দীর্ঘমেয়াদি, পরিমাপযোগ্য সরবরাহ চুক্তি প্রয়োজন। প্রয়োজনে ‘টেক অর পে’ চুক্তির মাধ্যমে ক্রেতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্ল্যান্টের সক্ষমতা তৈরি করার পর যদি ক্রেতা নিয়মিত গ্যাস না নেয়, তাহলে প্রকল্পের ইউনিট প্রতি ব্যয় বেড়ে যাবে। 
প্রশ্ন : এলএনজি পরিবহনের নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? 
ড. আমিনুল ইসলাম : অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রায়োজেনিক নিরাপত্তা, বয়েল-অফ গ্যাস ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি সাড়া এবং পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে। ভোলার ক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস সহনশীল নকশা প্রয়োজন। প্ল্যান্ট ও স্টোরেজ কোথায় স্থাপন করা হবে, তা ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। একই সাথে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে মিথেন নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। 
প্রশ্ন : বাংলাদেশ কিভাবে এ প্রকল্পে এগোতে পারে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সর্বোচ্চ তিন মাসের একটি স্বাধীন প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা যেতে পারে। সেখানে দৈনিক ৫, ১০, ২০ ও ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার বিকল্প, সড়ক, ফেরি ও বার্জের বিভিন্ন রুট, সম্ভাব্য গ্রাহক, স্টোরেজ চাহিদা এবং সিএনজি ও স্থায়ী পাইপলাইনের তুলনামূলক সরবরাহ ব্যয় দেখতে হবে। সমীক্ষাটি কোনো একটি প্রযুক্তি সরবরাহকারী বা আগ্রহী উদ্যোক্তার তথ্যের ওপর এককভাবে নির্ভর করা উচিত নয়। 
প্রশ্ন : প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ইতিবাচক ফল এলে কী করা উচিত? 
ড. আমিনুল ইসলাম : প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে প্রথম ধাপে দৈনিক ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার একটি মডুলার মাইক্রো এলএনজি প্ল্যান্ট দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। প্রকৃত উৎপাদন, প্ল্যান্টের নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি খরচ, পরিবহন সময়, ক্ষয়ক্ষতি, নিরাপত্তা ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো গ্যাসের মূল্য অন্তত এক বছর পর্যবেক্ষণ করা উচিত। ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। 
প্রশ্ন : মাইক্রো এলএনজি চালু হলে কি স্থায়ী পাইপলাইনের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে? 
ড. আমিনুল ইসলাম : না। স্থায়ী পাইপলাইনের মূল্যায়ন কখনো বন্ধ করা যাবে না। পর্যাপ্ত রিজার্ভ, দীর্ঘ উৎপাদনকাল এবং বড় স্থায়ী বাজার থাকলে শেষ পর্যন্ত পাইপলাইনই সস্তা হতে পারে। মাইক্রো এলএনজির কাজ হবে সেই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগ পর্যন্ত গ্যাসকে আটকে না রাখা। অন্য দিকে ছোট ও দূরবর্তী গ্যাসক্ষেত্রের ক্ষেত্রে স্মল-স্কেল এলএনজি স্থায়ী বিকল্প হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যদি অর্থনৈতিক হিসাব সেটিকে সমর্থন করে। 
প্রশ্ন : সবশেষে, বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির জন্য আপনার মূল বার্তা কী? 
ড. আমিনুল ইসলাম : বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি বাস্তবতায় দেশীয় গ্যাসের প্রতিটি সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভোলার গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাইক্রো এলএনজি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, আবার অবাস্তব ধারণাও নয়। প্রযুক্তিটি বিশ্বে পরীক্ষিত এবং ভোলায় আলোচিত গ্যাসের পরিমাণও আশাব্যঞ্জক। এখন প্রয়োজন স্লোগান নয়- নির্ভরযোগ্য রিজার্ভ ও উৎপাদন তথ্য, বাস্তব পরিবহন সমীক্ষা, নিশ্চিত ক্রেতা, স্বচ্ছ দরপত্র এবং সমমানের ভিত্তিতে এলএনজি, সিএনজি ও পাইপলাইনের তুলনা। 
সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে মাইক্রো এলএনজি প্ল্যান্ট ভোলার মতো আটকে থাকা গ্যাসক্ষেত্রকে দ্রুত বাজারের সাথে যুক্ত করতে পারে। গ্যাসসঙ্কটের সময়ে নিজেদের আবিষ্কৃত সম্পদ ব্যবহারের এমন সুযোগ অন্তত গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা করা উচিত।