
২০২৬ সালের সাহিত্যে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক অ্যান কারসন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে সুইডিশ একাডেমি তার নাম ঘোষণা করে। ধ্রুপদী সাহিত্য-ঐতিহ্যের সাথে সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন নতুন রূপ নির্মাণের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ পুরস্কার ঘোষণার সময় জানান, অ্যান কারসনকে তার ‘সাহসী ও অভিনব সাহিত্যকর্মের’ জন্য সম্মানিত করা হয়েছে। একাডেমির ভাষায়, ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সাথে খেলাচ্ছলে ও সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন নতুন রূপ তৈরি করেছেন।
এবারের নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। এর সাথে থাকবে নোবেল পদক ও সনদ। আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোমে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে অ্যান কারসনের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হবে।
কে এই অ্যান কারসন
অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে। বর্তমানে তার বয়স ৭৬ বছর। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গদ্য, নাট্যরচনা ও ধ্রুপদী সাহিত্যচর্চা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অসাধারণ কাজ তাকে সমকালীন ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠে পরিণত করেছে।
ছোটবেলায়ই প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুলজীবনে একজন লাতিন ভাষার শিক্ষকের কাছ থেকে প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখার সুযোগ তার সাহিত্যজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। পরে তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই ধ্রুপদী সাহিত্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদী সাহিত্য, তুলনামূলক সাহিত্য ও সৃজনশীল লেখালেখি পড়িয়েছেন। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি তার একাডেমিক গবেষণা ও সাহিত্যচর্চা সমানতালে এগিয়েছে।
গ্রিক পুরাণ থেকে আধুনিক মানুষের গল্প
অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, পুরাণ ও দর্শনের সাথে আধুনিক মানুষের জীবন, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ ও মানসিক দ্বন্দ্বের মেলবন্ধন। তিনি প্রচলিত অর্থে শুধু কবিতা লেখেন না; বরং কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাট্যরূপ ও চিত্রকলার নানা উপাদানকে একত্র করে নিজের জন্য এক স্বতন্ত্র সাহিত্যভাষা তৈরি করেছেন।
শব্দের উৎপত্তি, অর্থের পরিবর্তন এবং একটি শব্দ কীভাবে মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিকে নতুনভাবে প্রকাশ করতে পারে—এসব বিষয় তার লেখায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার সাহিত্যিক পদ্ধতিতে গবেষকের অনুসন্ধান, কবির কল্পনা এবং অনুবাদকের ভাষাবোধ একসাথে কাজ করে। এ কারণেই সমালোচকেরা তার লেখাকে প্রচলিত সাহিত্যিক শ্রেণিবিন্যাসের বাইরে থাকা এক ধরনের স্বতন্ত্র সৃষ্টি হিসেবে দেখেছেন।
‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ : যে বই তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে
অ্যান কারসনের সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’, প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। এটি মূলত পদ্যে লেখা একটি উপন্যাস, যেখানে প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের হারাক্লেস ও জেরিয়ন-সংক্রান্ত পুরাণকে আধুনিক সময়ের এক কিশোরের জীবন, প্রেম ও আত্মপরিচয়ের গল্পে রূপান্তর করা হয়েছে।
বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র জেরিয়ন একজন লাল রঙের ডানাওয়ালা কিশোর। প্রাচীন পুরাণের চরিত্রকে আধুনিক কৈশোর, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত করে কারসন যে সাহিত্যিক জগৎ তৈরি করেছেন, সেটিই বইটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ‘রেড ডক’ গ্রন্থেও তিনি একই পৌরাণিক জগতের চরিত্র ও ভাবনাকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনেন।
‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ ও টি এস এলিয়ট পুরস্কার
২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ অ্যান কারসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম। বইটির উপশিরোনাম ‘২৯টি ট্যাঙ্গোতে একটি কাল্পনিক প্রবন্ধ’। দাম্পত্য, প্রেম, আকর্ষণ, বিশ্বাসভঙ্গ ও সম্পর্কের ভাঙনকে কবিতা ও গদ্যের মিশ্রণে তিনি এখানে তুলে ধরেছেন।
এই বইয়ের জন্য তিনি ২০০১ সালে মর্যাদাপূর্ণ টি এস এলিয়ট পুরস্কার লাভ করেন। তিনিই এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম নারী সাহিত্যিক। এছাড়া তার দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ, গুগেনহেইম ফেলোশিপ, গ্রিফিন কবিতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্মান যুক্ত হয়েছে।
শুধু কবি নন, অসাধারণ অনুবাদকও
অ্যান কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার অনুবাদকসত্তা। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা তিনি আধুনিক ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তবে তার অনুবাদকে নিছক ভাষান্তর হিসেবে দেখা হয় না; অনেক ক্ষেত্রেই তিনি মূল রচনার সাথে সৃজনশীল সংলাপ তৈরি করেছেন।
ইউরিপিদিসের নাটক নিয়ে তার অনুবাদসংকলন ‘গ্রিফ লেসন্স’ এবং ‘অ্যান ওরেস্টিয়া’ বিশেষভাবে আলোচিত। প্রাচীন গ্রিক নাটকের ভাষা ও ভাবকে আধুনিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে সমকালীন ভাষার ব্যবহার করেছেন। এ কারণে তার অনুবাদ নিয়ে যেমন বিতর্ক হয়েছে, তেমনি ব্যাপক প্রশংসাও পেয়েছে।
আরো যেসব বই উল্লেখযোগ্য
‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ ও ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ ছাড়াও অ্যান কারসনের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’, ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’, ‘প্লেইনওয়াটার’, ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’, ‘ডিক্রিয়েশন’, ‘নক্স’, ‘রেড ডক’ এবং ‘ফ্লোট’। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নরমা’ও তার সাম্প্রতিক আলোচিত গ্রন্থগুলোর একটি।
তার লেখার বৈশিষ্ট্য হলো—একটি বইকে শুধু কবিতার বই, উপন্যাস বা প্রবন্ধের বই হিসেবে সহজে চিহ্নিত করা যায় না। কখনো একই গ্রন্থে কবিতা, গদ্য, নাটক, অনুবাদ, চিত্র, সমালোচনা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির উপাদান পাশাপাশি উপস্থিত থাকে। এই সীমাহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষাই তাকে সমকালীন সাহিত্যে আলাদা অবস্থান দিয়েছে।
কেন নোবেল পেলেন অ্যান কারসন
অ্যান কারসনের নোবেল পাওয়ার মূল কারণ তার সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য। সুইডিশ একাডেমি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে তার সেই সৃষ্টিশীল পদ্ধতিকে, যেখানে প্রাচীন গ্রিক ও ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে তিনি আধুনিক সাহিত্যিক রূপের সাথে মিলিয়েছেন। তার লেখায় অতীত কখনো নিছক ইতিহাস নয়; বরং বর্তমান মানুষের প্রেম, যন্ত্রণা, একাকিত্ব ও অস্তিত্বের প্রশ্ন বোঝার একটি জীবন্ত উপাদান।
তিনি একইসাথে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্য গবেষক। ফলে তার সাহিত্যকর্মে একদিকে যেমন গভীর পাণ্ডিত্য রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে কৌতুক, কল্পনা ও ভাষার প্রতি অসাধারণ সংবেদনশীলতা। এই দুইয়ের সমন্বয়ই তাকে প্রচলিত সাহিত্যধারার বাইরে গিয়ে নতুন রূপ নির্মাণের সুযোগ দিয়েছে।
নোবেলের আগে থেকেই ছিলেন সম্ভাব্য তালিকায়
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার কয়েক দিন আগে থেকেই অ্যান কারসনের নাম সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছিল। ল্যাডব্রোকসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় তিনি চীনা পরীক্ষামূলক লেখক কান শুয়ের সাথে অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। নোবেল ঘোষণার আগের দিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে কারসন ও কান শুয়েকে সমানভাবে এগিয়ে রাখা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনাই সত্যি হলো। ৮ অক্টোবর সুইডিশ একাডেমির ঘোষণায় অ্যান কারসনের নাম আসার মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের অন্যতম ব্যতিক্রমী এই লেখক পৌঁছে গেলেন বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে।
কানাডার সাহিত্যজগতে নতুন গৌরব
অ্যান কারসনের নোবেলজয় কানাডার সাহিত্যজগতেও বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে কানাডীয় সাহিত্যিক অ্যালিস মানরো সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন। কারসনের আগে থেকেই আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে কানাডার স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি হয়েছিল; তার নোবেলজয় সেই অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করল।
তবে কারসনের পরিচয় কেবল কানাডীয় কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক বিশ্বসাহিত্যিক, যার লেখায় প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক উত্তর আমেরিকা, পুরাণ থেকে ব্যক্তিগত জীবন এবং গবেষণা থেকে কবিতা—সবকিছুর মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।
৭৬ বছর বয়সে এসে সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে অ্যান কারসনের দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা পেল নতুন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। তার নোবেলজয় একইসাথে প্রমাণ করল—সাহিত্যের শক্তি শুধু পরিচিত কাঠামোর মধ্যে নয়; কখনো কখনো সেই কাঠামো ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন ভাষা ও রূপ সৃষ্টি করার মধ্যেও নিহিত থাকে।
তবে কানাডীয় এই কবি ও প্রাবন্ধিক পার্কিনসন রোগে (Parkinson’s disease) আক্রান্ত। ২০২৪ সালের আগস্টে লন্ডন রিভিউ অব বুকস (London Review of Books)-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি নিজেই প্রথমবার এই রোগ নির্ণয়ের কথা প্রকাশ্যে জানান। পার্কিনসন রোগের কারণে তার হাতের লেখা ও শারীরিক নড়াচড়ায় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং এর সাথে লড়াই করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লেখালিখিও করেছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








