ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নাগরিক অধিকার সংস্থার

 মিডল ইস্ট আই
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানকে সংবিধানবহির্ভূত ও অসাংবিধানিক দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আদালতে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক নাগরিক অধিকার সংস্থা ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল (এনআইএসি)। মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসে অনুমোদন গ্রহণ না করা এবং চলমান এই সামরিক অভিযানের নির্দিষ্ট কোনো সমাপ্তির সময় বেঁধে না দেয়ার অভিযোগে গতকাল বৃহস্পতিবার ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার জেলা আদালতে বিচারিক আর্জি পেশ করে সংগঠনটি।
সংগঠনটির পক্ষে ১৬ পৃষ্ঠার ওই নালিশপত্র জমা দেন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী অ্যালান মরিসন ও ব্রুস ফেইন। সিদ্ধান্তটি সর্বসমক্ষে প্রকাশের লক্ষ্যে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে অ্যালান মরিসন জানান, আদালত মামলাটি গ্রহণে অনীহা দেখালেও তারা এর শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়বেন। তিনি স্পষ্ট করেন, দীর্ঘ ২৩৬ বছরের ইতিহাসে যুদ্ধক্ষেত্রের পূর্ণ ক্ষমতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত জানাতে মার্কিন উচ্চ আদালত দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও বর্তমানে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষই এই যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে বিদ্যমান এই প্রেক্ষাপট আদালতকে মামলাটি বিবেচনার সুযোগ বাড়িয়ে তুলতে পারে। চলতি বছরের গত জুন মাসে প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা সীমিতকরণে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন পাস করা হয়। তৎকালীন সময়ে এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউজ দাবি করে, প্রত্যাহারের মতো অনাকাক্সিক্ষত কোনো শত্রুভাবাপন্ন পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান নেই। প্রশাসন নিশ্চিত করে যে, ৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ফেব্রুয়ারির সামরিক উত্তেজনার সমাপ্তি ঘটেছে। তবে চলতি মাসের শুরুতে ইরানের দক্ষিণ সামুদ্রিক এলাকায় মার্কিন বিমানবাহিনীর হামলার মাধ্যমে সেই যুদ্ধবিরতির বাস্তব কার্যকারিতা নস্যাৎ হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনআইএসি সভাপতি জামাল আবদি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন শাসন কাঠামোর যে অরক্ষিত রূপ প্রকাশ করেছেন, সেগুলোকে ইতঃপূর্বে অনড় সুরক্ষাকবচ মনে করা হতো। তিনি মন্তব্য করেন, কেবল এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া বন্ধ করাই লক্ষ্য নয়; বরং ভবিষ্যতে যাতে কোনো প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্টের প্রশাসনিক সম্মতি ছাড়া অন্য দেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে না পারেন, সেই নজির স্থাপন করাই এই আইনি পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। মার্কিন সংবিধানে একচ্ছত্রভাবে পার্লামেন্টকে সামরিক যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা অর্পণ করা হলেও ঐতিহাসিকভাবে নির্বাহী দফতর অতিরিক্ত সামরিক সার্বভৌমত্ব চর্চা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সামরিক পদক্ষেপকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না বলে ‘সাময়িক সঙ্ঘাত বা সংঘর্ষ’ হিসেবে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান। সেই দাবির কঠোর জবাবে মরিসন বলেন, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রে সাত মাস ধরে ধারাবাহিক বোমাবর্ষণ, সমুদ্র অবরোধ ও ৪৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে অসংখ্য মানুষের জীবনহানি ঘটানোকে যুদ্ধ ছাড়া ভিন্ন কিছু বলার অবকাশ নেই।
এনআইএসি অ্যাকশনের দায়ের করা এই মামলার দফায় সরাসরি ভুক্তভোগী একাধিক ইরানি-আমেরিকানের ক্ষতির হিসাব লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত কাউসার গওহরি জানান, ইরানে তার ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ আত্মীয় ও দুই মাসের এক শিশুসহ পরিবারের চার সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আবেগপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমেরিকার নাগরিক হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতা এড়ানো সম্ভব নয় এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো এখন সময়ের দাবি। মামলায় উল্লিখিত অন্যান্য তথ্যে দেখা যায়, নিমা দিলমাঘানি নামের এক সদস্যের বোন কর্মস্থলে বোমা হামলায় গুরুতর পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং তার বহু সহকর্মী নিহত হয়েছেন। সাবেক মার্কিন সেনা অ্যালান ব্যান্ডের তেহরানে অবস্থানরত স্বজনরা সার্বিক বিদ্যুৎ-পানি সঙ্কট ও বিকট বিস্ফোরণের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অন্য দিকে পারভীন এসমাইলজাদেহের স্বজনরা গভীর মানসিক ট্রমা ও আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিবারের শিশুদের শিক্ষাজীবন পুরোপুরি থমকে গেছে।