
এশিয়া টাইমস
সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি, লাগামহীন সরকারি ব্যয়, বাজেট ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব অর্থনীতি এক মারাত্মক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বন্ড বাজারের বিনিয়োগকারীরা আবারো শক্ত অবস্থান নিয়ে বাজারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ দিনের সুরক্ষিত বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত প্রধান সরকারি ঋণের বাজারগুলোতে ইয়েল্ড বা মুনাফার হার দ্রুত বাড়ায় বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্যমতে, চলতি ২০২৬ সালের শুরুতেই বৈশ্বিক মোট ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে ঠেকেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যৌথ অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় সাতগুণ। এমন নাজুক প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ইতিবাচক হলেও বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি মাত্র দুই মাস বাড়ানো ছাড়া বড় কোনো সমাধান আসেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর নিয়ন্ত্রণ, চীনা বিনিয়োগ ও তাইওয়ান ইস্যু ঘিরে দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব এখনো অপরিবর্তিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, বন্ড বাজারের বর্তমান সঙ্কেত ২০২৬ সালের শেষভাগে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডিবিয়ার গ্রুপের প্রধান নির্বাহী নাইজেল গ্রিন জানান, বিশ্বজুড়ে সুদের হার কমার আশায় যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের হিসাব পুরো ওলটপালট হয়ে গেছে। সবচেয়ে তীব্র সঙ্কেত এসেছে জাপান থেকে, যেখানে ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের ইয়েল্ড বিগত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ শতাংশে উঠেছে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডেও গত বৃহস্পতিবার একই ধরনের রেকর্ড দেখা গেছে, যাকে ব্যবসায়ীরা ‘কৃষ্ণাঙ্গ বৃহস্পতিবার’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর মেয়াদী বন্ডের ইয়েল্ড ২২ বছর এবং ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের ইয়েল্ড দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইউরোপের পরিস্থিতিও বেশ উদ্বেগজনক। ফ্রান্সে ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের মুনাফা বেড়ে ৪.৬ শতাংশ হয়েছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর সর্বোচ্চ। ইতালি, গ্রিস ও জার্মানিও একই ধরনের সুদের হারের ঊর্ধ্বগতির মুখোমুখি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন যে, মার্কিন ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের ইয়েল্ড ৫ শতাংশে পৌঁছালে তা শেয়ার বাজার ও রাজস্ব স্থায়িত্বের জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে। মূল্যস্ফীতি, ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট ও এআই-বাবল ভীতির মধ্যেও ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট শেয়ার বাজারের ইতিবাচক দিক দেখলেও ব্যাংক অব আমেরিকা তাদের পূর্বাভাস বাড়িয়ে দুই বছর মেয়াদী বন্ডের ইয়েল্ড ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। আইআইএফের অর্থনীতিবিদ এমরে তিফতিকের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি জিডিপির তুলনায় ঋণের হারকে কাগজে-কলমে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখালেও ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে আড়াল করে রাখছে। বর্তমানে উন্নত বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, প্রতিরক্ষা বা এআই খাতের মোট বিনিয়োগের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করছে কেবল সুদের দায় মেটাতে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ হ্যানো লাস্টিক ও অ্যালিয়ানজের মোহামেদ এল-এরিয়ান উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালের সঙ্কটের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কৃত্রিম কম সুদের নীতি এবং বন্ড কেনার প্রবণতা সরকারকে কম সুদে ঋণের অভ্যাসে ফেলেছিল। এখন সুদের হার বাড়ায় সেই কৃত্রিম সুবিধা শেষ হয়ে বাস্তব বাজার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফিচ-এর গবেষণা শাখা বিএমআই সতর্ক করেছে যে, বন্ড ইয়েল্ড বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার শর্ত কঠিন করবে। এর ফলে একটি ভয়াবহ ‘ক্রেডিট ক্রাঞ্চ’ বা ঋণ সঙ্কট দেখা দিতে পারে, যা উন্নত অর্থনীতির মূল ভিত্তি পারিবারিক ও ব্যবসায়িক খরচ স্তব্ধ করে দেবে।
এই বৈশ্বিক ঝড়ের মধ্যে ফ্রান্সের ভঙ্গুর অর্থনীতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইউরোজোনের অন্যতম বড় ঘাটতি মেটাতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন ল্যকরনু আগামী অক্টোবরের শুরুর মধ্যে ৫৪ বিলিয়ন ইউরো সরকারি ব্যয় ছাঁটাইয়ের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশটির সরকারি হিসাব মতে, ২০২৬ সালে ফরাসি ঋণ জিডিপির ১১৯.৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ল্যকরনু তার কঠোর বাজেটে অনড়। অন্যদিকে, বৈশ্বিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে জাপান। ইয়েনের মান ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় মার্কিন ট্রেজারি প্রধান স্কট বেসেন্ট ১৯৯৮ সালের পর প্রথম যৌথ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েন স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেন। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হলেও জাপানের দুর্বল মুদ্রা মার্কিন উৎপাদন খাতকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। তাছাড়া জাপান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ধারক। নিজেদের মুদ্রা রক্ষায় টোকিও যদি মার্কিন ডলার বিক্রি শুরু করে, তবে তা বৈশ্বিক বন্ড বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং ওইসিডি উভয়ই জোর দিয়ে বলেছেন যে, বর্তমান সঙ্কটে ঋণের চাপ কমানো, শক্ত রাজস্ব নীতি গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।








