
১৯২০ সালে লাঙলের ফলা মাটির নিচে থাকা বিশাল এক ধাতব বস্তুর গায়ে ধাক্কা খায়। পরে জানা যায়, সেটিই পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ড। মহাকাশ থেকে ছুটে আসা এই বিশাল ধাতব খণ্ড মাটিতে পড়লেও তৈরি হয়নি কোনো গর্ত।
১৯২০ সাল। উত্তর নামিবিয়ার একটি খামারে জমি চাষ করছিলেন জ্যাকবাস হারমানুস ব্রিটস। বলদের পেছনে লাঙল নিয়ে মাঠের একদিকে এগোচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ লাঙলের ফলা বিকট ধাতব শব্দ করে কোনো শক্ত বস্তুর গায়ে আটকে গেল। কয়েক ইঞ্চি মাটির নিচে পড়ে ছিল কালো রঙের বিশাল এক বস্তু।
এই ঘটনার কাহিনি তুলে ধরেছেন ডেইলি গ্যালাক্সির জাপানভিত্তিক সাংবাদিক আরেজকি আমিরি। আলজেরীয় বংশোদ্ভূত আমিরি ডেইলি গ্যালাক্সির প্রধান সম্পাদক ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করেন তিনি। ইংরেজি ভাষায় স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি তাঁর রয়েছে বিদেশি ভাষা ও নার্সিং বিষয়ে ডিপ্লোমা। মহাকাশ গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও সমাজের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে, তা সহজ ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন দেশের পাঠকের কাছে বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো বোধগম্য করে তোলাই তাঁর লেখালেখি ও সম্পাদকীয় কাজের অন্যতম লক্ষ্য।
খামারটির নাম হোবা ওয়েস্ট। ছোট শহর গ্রুটফন্টেইন থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান। চারপাশে সমতল ভূমি। মাটির বেশির ভাগই ফ্যাকাশে চুনাপাথরের। এমন জায়গায় কালো ধাতব বস্তুটি দেখে বিস্মিত হন ব্রিটস।
সেদিন হতবাক জ্যাকবাস হারমানুস ব্রিটস মাটি খুঁড়ে বস্তুটির কিছু অংশ বের করেন। ছেনি দিয়ে সামান্য নমুনাও সংগ্রহ করেন। পরে সেটি নিয়ে ছুটলেন গ্রুটফন্টেইনে সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকা কোম্পানির কার্যালয়ে। পরীক্ষা করে জানানো হয়, এটি একটি উল্কাপিণ্ড। অর্থাৎ মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ছুটে আসা এমন পাথর বা ধাতব খণ্ড, যা বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে মাটিতে পৌঁছেছে।
ব্রিটসের আবিষ্কারের পর খননকাজ যত এগোয়, ততই বিস্ময় বাড়ে। দেখা যায়, উল্কাপিণ্ডটির শুধু ওপরের প্রশস্ত অংশটুকু মাটির ওপরে ছিল। বাকি অংশ আটকে ছিল শক্ত সাদা চুনা মাটির স্তরে। ১৯২০-এর দশকে এর চারপাশে বৃত্তাকার গর্ত খুঁড়ে নিচের অংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর কাজটি করা হয়।
এভাবেই পাওয়া যায় হোবা উল্কাপিণ্ড। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ড এটি। পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া লোহার একক পিণ্ডের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ও ভারী।
ওজন ৬০ টনের বেশি। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ২ দশমিক ৭ মিটার বা ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি করে। পুরুত্ব প্রায় শূন্য দশমিক ৯ মিটার বা ২ ফুট ১১ ইঞ্চি। তুলনা করলে, একটি সাধারণ ডাবল খাটের মাপ প্রায় সাড়ে ৪ ফুট বাই সাড়ে ৬ ফুট। অর্থাৎ হোবা উল্কাপিণ্ডটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ—দুই দিকেই একটি বড় ডাবল খাটের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া। আশ্চর্যের বিষয়, আবিষ্কারের পর থেকে হোবা উল্কাপিণ্ডকে তার জায়গা থেকে একবারও সরানো হয়নি।
শিকার করতে গিয়ে প্রথম দেখেছিলেন
ব্রিটসের আবিষ্কারের গল্পের আরেকটি বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর নিজের লেখা ১৯২০ সালের প্রতিবেদনে। সেটি গ্রুটফন্টেইনের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। পরে ১৯৫৪ সালের অক্টোবরে, ৭৫ বছর বয়সে, তিনি আরেকটি বিবৃতি দেন। সেখানে ঘটনার বর্ণনা কিছুটা আলাদা।
২০০৮ সালে প্রকাশিত উল্কাপিণ্ডটির ইতিহাসবিষয়ক একটি বইয়ে সেই বিবরণ সামনে আসে। ব্রিটস জানান, এক শীতের দিনে শিকারে বেরিয়ে তিনি অদ্ভুত পাথরটি দেখতে পান। তাঁর ভাষায়, ‘আমি অদ্ভুত পাথরটি দেখে তার ওপর বসি এবং পরীক্ষা করে দেখি।’
পাথরটির রংই প্রথম তাঁর নজর কাড়ে। চারপাশের মাটি যেখানে ফ্যাকাশে চুনাপাথরের, সেখানে বস্তুটি ছিল কালো। ছুরি দিয়ে এর ওপরের স্তর ঘষতেই ভেতরে চকচকে ধাতু দেখতে পান তিনি। পরে বাড়ি থেকে ছেনি এনে এর একটি টুকরা ভেঙে শহরে নিয়ে যান।
ব্রিটসের স্ত্রীও পরে নিজ হাতে খুঁড়ে উল্কাপিণ্ডটির কিছু অংশ বের করেছিলেন। পরিবারের ধারণা ছিল, এর ওজন প্রায় ৮০ টন। এর অস্বাভাবিক চৌকো ও সমতল আকৃতি দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। এমনকি খনিবিষয়ক এক কর্মকর্তা ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো কোনো বিশাল যুদ্ধবিমানের বর্মের অংশ।
কাটা যায় না, সরানোও যায় না
কোম্পানির কর্মকর্তারা পরীক্ষা করতে গিয়ে বুঝতে পারেন, এই ধাতব খণ্ড নিয়ে কাজ করা সহজ নয়। ১৯২১ সালের মে মাসে গ্রুটফন্টেইনের ব্যবস্থাপক এর ওজন প্রথমে ৮৭ টন বলে অনুমান করেন। পরে সতর্কতার সঙ্গে ৬০ টন হিসাব করেন।
তিনি দেখতে পান, লোহাটি আঘাতে সহজে ভাঙার মতো শক্ত ও ভঙ্গুর নয়। বরং বেশ নমনীয়। বিস্ফোরক দিয়ে আঘাত করলেও তা ভেঙে টুকরা করা কঠিন হবে।’ তাই করাত ও ধাতু কাটার বিশেষ গ্যাসচালিত যন্ত্র বা কাটার টর্চ দিয়ে কাটার পরিকল্পনা করা হয়। ওই বছরের শেষ দিকে শ্রমিকেরা জানান, একটি ছোট শিমের দানার সমান টুকরা ভাঙতেই প্রায় ১০ মিনিট পরিশ্রম করতে হয়েছে।
প্রিটোরিয়ার কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন উল্কাপিণ্ডটি, অথবা অন্তত এর বড় একটি অংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো জাদুঘরে নিয়ে যেতে। কিন্তু খনিবিষয়ক পরিদর্শক জানান, এত বড় বস্তু সরিয়ে নেয়া অসম্ভব। হাতে কেটে টুকরা করাও বাস্তবসম্মত নয়। ফলে এটি সেখানেই থেকে যায়।
১৯২৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একজন খনিজবিদ উল্কাপিণ্ডটি মেপে দেখেন। তাঁর হিসাবে, উল্কাপিণ্ডটির ওপরের অংশের দৈর্ঘ্য ছিল ২ দশমিক ৯৫ মিটার (প্রায় ৯ ফুট ৮ ইঞ্চি) এবং প্রস্থ ২ দশমিক ৮৪ মিটার (প্রায় ৯ ফুট ৪ ইঞ্চি)। একদিকে এ ১ দশমিক ২২ মিটার (প্রায় ৪ ফুট) পুরু, অন্যদিকে শূন্য দশমিক ৫৫ মিটার (প্রায় ১ ফুট ১০ ইঞ্চি)। এই মাপ অনুযায়ী এর ওজন প্রায় ৬১ টন।
৪৫০ কোটি বছরের পুরোনো ধাতু
হোবা উল্কাপিণ্ড এত শক্ত হওয়ার কারণ এর উপাদান। এতে প্রায় ৮৪ শতাংশ লোহা এবং ১৬ শতাংশ নিকেল রয়েছে। সামান্য পরিমাণ কোবাল্টও আছে।
বিজ্ঞানীরা একে ‘অ্যাটাক্সাইট’ শ্রেণির উল্কাপিণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর অর্থ, এর ভেতরে কোনো সুনির্দিষ্ট স্ফটিক কাঠামো নেই। সাধারণ লোহার উল্কাপিণ্ড কেটে পালিশ করলে ধাতব স্ফটিকের আড়াআড়ি নকশা দেখা যায়। কিন্তু হোবায় নিকেলের পরিমাণ এত বেশি যে সেই নকশা তৈরি হয়নি।
উল্কাপিণ্ডটি রাসায়নিক গঠনের দিক থেকে বিরল একটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। উল্কাপিণ্ডবিষয়ক আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডারে এর পরিচয় গ্রুপ আইভিবি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আদি যুগের ছোট ছোট গ্রহসদৃশ বস্তুর গলিত কেন্দ্র থেকে এ ধরনের ধাতুর সৃষ্টি হয়েছিল। এসব বস্তু তৈরি হওয়ার সময় ভারী লোহা ধীরে ধীরে কেন্দ্রের দিকে জমা হয়।
গ্রুপ আইভিবির বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। অর্থাৎ সৌরজগতের জন্মের কাছাকাছি সময়ের এই ধাতু। হোবা উল্কাপিণ্ডের দুই পাশ বেশ সমতল। এর গায়ে ছোট ছোট গর্তও রয়েছে। বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে আসার সময় বাইরের স্তর গলে যাওয়ায় এসব গর্ত তৈরি হয়েছে।
এত বড় উল্কাপিণ্ড, অথচ গর্ত তৈরি হয়নি!
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ৮০ হাজার বছরেরও কিছু আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে হোবা উল্কাপিণ্ড। সে সময় আকাশের ঘটনা লিখে রাখার মতো মানুষ ছিল না। সাধারণত এত ভারী কোনো বস্তু মাটিতে পড়লে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু হোবার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি।
এটি পড়েছিল সমতল ভূমিতে। সেখানে নেই কোনো গর্ত, উঁচু মাটির কিনারা কিংবা চারপাশে ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষ।
এর ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে উল্কাপিণ্ডটির আকৃতিতে। খোলা প্যারাশুটের মতো এর প্রশস্ত সমতল অংশ বায়ুমণ্ডলে নামার সময় প্রচুর বাতাসের বাধা পেয়েছিল। ফলে এর গতি কমে যায়।
বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এর গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১০ কিলোমিটারেরও বেশি। ঘণ্টায় প্রায় ২২ হাজার মাইল। মাটিতে পৌঁছানোর আগে গতি কমে দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক ২ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার। ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার ২০০ মাইল। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রান্তিক বেগ। অর্থাৎ বাতাসের বাধা ও মাধ্যাকর্ষণের টান সমান হয়ে গেলে কোনো পতনশীল বস্তু যে স্থির গতিতে নামতে থাকে।
এই কমে আসা গতির কারণেই উল্কাপিণ্ডটি মাটির ভেতরে ঢুকে যায়। কিন্তু বিস্ফোরণের মতো কোনো গর্ত তৈরি হয়নি। আবার ভেঙেও যায়নি টুকরো টুকরো হয়ে।
স্মারক সংগ্রহ করতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত
এত ভারী বলে উল্কাপিণ্ডটি সরানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাতে এর ক্ষতবিক্ষত হওয়া ঠেকানো যায়নি। কয়েক দশক ধরে স্মারক সংগ্রহের আশায় অনেকে করাত, ছেনি ও কাটার টর্চ দিয়ে এর অংশ কেটে নিয়েছেন। এখনো এর কিনারায় সেই কাটার দাগ দেখা যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় এর ১৮টি খণ্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে সেগুলোর ওজন প্রায় ২৫ কেজি। ১৯৬৮ সালে এক দর্শনার্থী হাতে করাত চালিয়ে ২ দশমিক ৮ কেজি ওজনের একটি টুকরা কেটে নেন। স্মারক হিসেবে সংগ্রহ করতে তাঁর সময় লেগেছিল তিন থেকে চার ঘণ্টা। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে লস অ্যাঞ্জেলেসে বনহামসের নিলামে সেই খণ্ডটি ৫৯ হাজার ৬২ ডলারে বিক্রি হয়।
উল্কাপিণ্ডটি রক্ষায় তৎকালীন সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকার সরকার ১৯৫৫ সালের ১৫ মার্চ একে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ঘোষণা করে। ১৯৭৯ সালে সংরক্ষিত এলাকার আয়তন বাড়িয়ে ৪২৫ বর্গমিটার করা হয়।
১৯৮৭ সালে খামারের মালিক উল্কাপিণ্ডটি এবং এর আশপাশের জমি রাষ্ট্রকে দান করেন। একই বছর সেখানে ধাপে ধাপে তৈরি করা হয় পাথরের একটি উন্মুক্ত মঞ্চ এবং দর্শনার্থীদের জন্য কেন্দ্র। এরপর বন্ধ হয় উল্কাপিণ্ডটির গায়ে আঘাত করে টুকরা সংগ্রহের ঘটনা। এখন প্রতিবছর হাজারো পর্যটক নামিবিয়ায় আসেন এটি দেখতে।
হোবা নামটি এসেছে নামিবিয়ার খোয়েখোওয়াব ভাষা থেকে। শব্দটির অর্থ ‘উপহার’।
আজও হোবা ওয়েস্ট খামারে সেই একই জায়গায় পড়ে আছে ৬০ টনের বেশি ওজনের উল্কাপিণ্ডটি। ৮০ হাজার বছরেরও কিছু আগে যেখানে এসে পড়েছিল, সেই শক্ত চুনা মাটির স্তরেই আটকে আছে এটি। চারপাশে বৃত্তাকারে উঠে গেছে পাথরের তৈরি দর্শকসারির ধাপ। মহাকাশ থেকে আসা ৪৫০ কোটি বছরের পুরোনো এই ধাতব খণ্ড যেন পৃথিবীর বুকে এক বিস্ময়কর ইতিহাসের সাক্ষী।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








