
‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’ বাংলার এই পরিচিত ছড়ার কথাই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন জার্মানির একদল গবেষক। যে প্লাস্টিক ব্যবহার শেষে আমরা আবর্জনায় ফেলে দিই, তা থেকেই শক্তিশালী লেজারের সাহায্যে তৈরি করেছেন অগণিত অতি ক্ষুদ্র হীরা। শুধু তা-ই নয়, ঘণ্টায় ২২ হাজার মাইলেরও বেশি বেগে ছুটে চলা হীরাগুলো অক্ষত অবস্থায় সংগ্রহ করতেও পেরেছেন তাঁরা। আবর্জনা ভেবে ফেলে দেয়া কোনো কিছুর মধ্যেও যে মূল্যবান সম্পদ তৈরির সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে, এই গবেষণা তারই এক নতুন দৃষ্টান্ত।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ডেইলি গ্যালাক্সি রোববার (২৫ অক্টোবর) জানায়, জার্মানির হেলমহোলৎজ সেন্টার ড্রেসডেন-রসেনডর্ফ এবং রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই সাফল্য পেয়েছেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপচুন ও ইউরেনাসের গভীরে বিরাজমান চরম তাপ ও চাপের পরিবেশ পরীক্ষাগারে তৈরি করা। ডেইলি গ্যালাক্সির এই প্রতিবেদন লিখেছেন সারাহ জোন্স। তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং গণমাধ্যম ও ডিজিটাল সংস্কৃতি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি ডেইলি গ্যালাক্সি দলে যোগ দেন।

লেজারের আঘাতে প্লাস্টিক থেকে হীরা
নেপচুন ও ইউরেনাসের গভীরে তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। সেখানে চাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চাপের কয়েক লাখ গুণ। এমন পরিবেশে কার্বনসমৃদ্ধ পদার্থের কী পরিবর্তন ঘটে, তা বুঝতে গবেষকেরা প্লাস্টিকের ওপর শক্তিশালী লেজার নিক্ষেপ করেন।
লেজারের আঘাতে তৈরি হয় তীব্র অভিঘাত তরঙ্গ। বা লেজারের আঘাতে তৈরি হয় প্রচণ্ড চাপের এক তরঙ্গ। এর তীব্র চাপে ও তাপে প্লাস্টিকের কার্বন পরমাণুগুলো থেকে তৈরি হয় অতি ক্ষুদ্র হীরা। এর প্রচণ্ড চাপ ও তাপে প্লাস্টিকের কার্বন পরমাণু থেকে তৈরি হয় অতি ক্ষুদ্র হীরা। এগুলোকে বলা হয় ন্যানোডায়মন্ড।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ডায়মন্ড অ্যান্ড রিলেটেড ম্যাটেরিয়ালস সাময়িকীতে। আগের পরীক্ষায়ও এভাবে হীরা তৈরির প্রমাণ মিলেছিল। তবে সেগুলোকে অল্প সময়ের জন্য শনাক্ত করা যেত। এবার গবেষকেরা হীরাগুলো সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে পেরেছেন।
রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডমিনিক ক্রাউস বলেন, এমন পরিবেশে ন্যানোডায়মন্ড তৈরি হবে বলে তাঁরা আশা করেছিলেন। তবে খুব দ্রুত তা তৈরি হয়ে তাঁদের বিস্মিত করেছে।
প্রাগের কাছে এক্সট্রিম লাইট ইনফ্রাস্ট্রাকচার গবেষণাকেন্দ্রে পরীক্ষাটি চালানো হয়। সেখানে মাত্র ১০০ মাইক্রোমিটার পুরু পিইটি প্লাস্টিকের পাতের ওপর প্রতি মিনিটে তিনবার লেজার নিক্ষেপ করা হয়।
ঘণ্টায় ২২ হাজার মাইল বেগে ছুটে চলা হীরা ধরলেন যেভাবে
প্লাস্টিকের পাতের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর সদ্য তৈরি হীরাগুলো শূন্যস্থানে ছিটকে বেরিয়ে আসে। তাদের গতি সেকেন্ডে ১০ কিলোমিটারের বেশি, অর্থাৎ ঘণ্টায় ২২ হাজার মাইলেরও বেশি। উল্কাপিণ্ডের আঘাতের গতির সঙ্গে এর তুলনা করা যায়।

এত দ্রুতগতির হীরা শক্ত কোনো বস্তুতে আঘাত করলে ভেঙে যেতে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারত। তাই গবেষকদের এমন একটি উপাদান দরকার ছিল, যা হীরাগুলোকে অক্ষত অবস্থায় ধরে রাখতে পারবে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা পানিতে দ্রবণীয় এক ধরনের আয়নিক জেল ব্যবহার করেন। শূন্যস্থানের মধ্যেও কার্যকর এই জেল ছুটে আসা হীরাগুলোর আঘাত সামলে নেয়। ফলে সেগুলো সংগ্রহ ও বিশুদ্ধ করা সম্ভব হয়।
প্রতি দফা লেজার প্রয়োগে তৈরি হয় প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ন্যানোডায়মন্ড। কিন্তু কয়েক শ মাইক্রোগ্রাম হীরা সংগ্রহ করতেই প্রায় ১০০ বার লেজার নিক্ষেপ করতে হয়েছে। প্রতিটি কণার আকার প্রায় তিন ন্যানোমিটার। এতে কার্বন পরমাণু রয়েছে আনুমানিক তিন হাজারটি।
সংগৃহীত হীরাগুলো পরীক্ষা করা হয় রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইএলএমআই-এমভি ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্রে। এই যন্ত্র দিয়ে পৃথক পরমাণুও পর্যবেক্ষণ করা যায়। গবেষণাটির প্রধান লেখক বেন হিউসার বলেন, বহু বছরের চেষ্টার পর সংগৃহীত হীরাগুলো সরাসরি পরীক্ষা করতে পারা ছিল তাঁদের জন্য বিশেষ এক মুহূর্ত।
চিকিৎসা ও নতুন প্রযুক্তিতে ব্যবহারের সম্ভাবনা
হীরার কঠোরতা, স্থিতিশীলতা ও তাপসহনশীলতার কারণে ঘষামাজা ও পালিশের কাজে ন্যানোডায়মন্ড আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়। তবে নতুন পদ্ধতিতে তৈরি হীরাগুলো অত্যন্ত ছোট, বেশি বিশুদ্ধ এবং প্রায় একই মাপের। বিস্ফোরণসহ প্রচলিত পদ্ধতিতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো একসঙ্গে পাওয়া কঠিন।
গবেষকদের মতে, এসব হীরা চিকিৎসার প্রয়োজনে চিত্র গ্রহণ, কোয়ান্টাম সেন্সর এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কাজে লাগতে পারে। কণা যত ছোট হয়, সম্মিলিতভাবে তাদের পৃষ্ঠতল তত বেড়ে যায়। ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সুযোগও বাড়ে। যেমন, সূর্যালোক ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ভাঙার মতো কাজে এগুলো সহায়ক হতে পারে।
হীরার সঙ্গে অন্য মৌল মিশিয়ে এর বৈশিষ্ট্য বদলানোও সম্ভব। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ডোপিং। অর্থাৎ খাদ মেশানো। এর মাধ্যমে ন্যানোডায়মন্ডকে এমআরআই পরীক্ষায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। এমআরআই যন্ত্রে শরীরের ভেতরের অঙ্গ ও টিস্যুর ছবি আরো স্পষ্ট করতে বিশেষ কিছু পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এগুলো ছবিতে বিভিন্ন টিস্যুর পার্থক্য ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। ন্যানোডায়মন্ড ভবিষ্যতে এমন পদার্থ তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
হীরার চেয়েও ঘন কার্বন তৈরির লক্ষ্য
গবেষকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন বাড়ানো। প্রতি দফা লেজার প্রয়োগে বিপুলসংখ্যক হীরা তৈরি হলেও সংগ্রহ করা যাচ্ছে অতি সামান্য পরিমাণ। লেজার প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়িয়ে মিলিগ্রাম পরিমাণ হীরা সংগ্রহ করাই তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য।
এ ছাড়া গবেষকেরা কার্বনের আরেকটি বিশেষ রূপ বিসি-৮ তৈরির পরিকল্পনা করছেন। বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক ধারণা, কার্বনের এই রূপ হীরার চেয়ে বেশি ঘন হবে। এর কঠিনত্ব হবে হীরার সমান, তবে ভঙ্গুরতা হবে তুলনামূলক কম। অর্থাৎ আঘাতে ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা কম হতে পারে। প্লাস্টিক থেকেই এই পদার্থ তৈরি করা যায় কি না, তা যাচাই করতে নভেম্বর মাসে আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করে প্রথম পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
ফেলে দেয়া প্লাস্টিক থেকে হীরা তৈরির এই সাফল্য এখনই বিপুল পরিমাণ হীরা উৎপাদন বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। উৎপাদন বাড়ানোসহ বেশ কিছু বাধা অতিক্রম করতে হবে। তবে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সাধারণ প্লাস্টিকের মধ্যেও এমন উপাদান রয়েছে, যা বিশেষ পরিবেশে মূল্যবান স্ফটিকে রূপ নিতে পারে।
বাংলার সেই ছড়ার কথায় ফিরলে, ছাইয়ের নিচে রতন খুঁজে পাওয়ার জন্য দরকার অনুসন্ধানের চোখ। বিজ্ঞানীরা সেই চোখ দিয়েই আবর্জনা হিসেবে পরিচিত প্লাস্টিকের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন হীরা তৈরির সম্ভাবনা। এখন দেখার বিষয়, গবেষণাগারের এই সাফল্যকে কত দূর বাস্তব প্রয়োগে নিয়ে যাওয়া যায়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








