কসরত,  যুক্তরাষ্ট্র,  গোপন, অত্যাধুনিক, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, গুরুত্বপূর্ণ, যন্ত্রাংশ, চীনের হাতে,
যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। সংগৃহীত

 এক টুনটুনি টুন টুনাল, সাত রানির নাক কাটা গেল! এ ঘটনাও যেন অনেকটা তেমনই। একটি ইমেইলের সতর্কবার্তা চোখ এড়িয়ে গেল। আর তাতেই যুক্তরাষ্ট্রের  অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রাংশ পৌঁছে গেল শত্রুভাবাপন্ন চীনের হাতে।

Advertisement

ইমেইলের সতর্কবার্তা এড়িয়ে যাওয়ার সাথে যোগ হয়েছিল শেষ মুহূর্তে সামরিক চালানের পথ বদলে যাওয়ার ঘটনা। দুইয়ে দুইয়ে চার। মার্কিন যুদ্ধবিমানের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ গিয়ে পৌঁছাল হংকংয়ে। চালানে ছিল বিমানের ককপিটের সামনের স্বচ্ছ ঢাকনা এবং অস্ত্র রাখার খোপের একটি দরজা। সামরিক প্রযুক্তির দিক থেকে দুটিই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম ফার্স্ট পোস্ট বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে জানায়, একের পর এক ভুলের কারণে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের এসব যন্ত্রাংশ শেষ পর্যন্ত চীনের হাতে পৌঁছায়। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান হয়ে চালানটি সান ফ্রান্সিসকোতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পথ বদলে সেটি পৌঁছে যায় হংকংয়ে। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে যুক্তরাষ্ট্রে।

ইয়েমেনে হাউছি বিদ্রোহীদের ওপর আসন্ন সামরিক হামলা নিয়ে আলোচনার সময় ভুল করে দ্য আটলান্টিক সাময়িকীর সম্পাদকের নাম সিগন্যাল গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত করে ফেলার ঘটনা মনে আছে? মার্কিন কর্মকর্তাদের সেই ভুলে ব্যাপক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এবারের ঘটনাও মার্কিন সামরিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। তবে এবার পরিণতি আরো গুরুতর হতে পারে। কারণ, এবার এমন কিছু যন্ত্রাংশ চীনের হাতে পৌঁছেছে, যেগুলোর প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে বহু বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

 কীভাবে চোখ এড়িয়ে গেল সতর্কবার্তা

ঘটনার শুরু একটি ইমেইল থেকে। এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের পক্ষে চালানটি পরিবহনের দায়িত্বে ছিল পণ্য পরিবহন প্রতিষ্ঠান ডিএসভি এ/এস। প্রতিষ্ঠানটি ইউনাইটেড পার্সেল সার্ভিসকে (ইউপিএস) ইমেইল করে সতর্ক করেছিল, মার্কিন অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণবিধি অনুযায়ী এফ-৩৫-এর যন্ত্রাংশ নির্দিষ্ট কিছু দেশের মধ্য দিয়ে নেয়া যাবে না। কিন্তু ইউপিএসের এক কর্মীর চোখ এড়িয়ে যায় সেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

চালানটি অস্ট্রেলিয়া থেকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে ছাড়ে। দেরি পুষিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে শেষ পর্যন্ত সেটি ভুল পথে পাঠানো হয়। ব্লুমবার্গকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যবিধির উদ্দেশ্য হলো, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের হাতে পৌঁছানো ঠেকানো। ডিএসভি আগেই ইউপিএসকে ইমেইল করে জানিয়েছিল, এ চালানের ক্ষেত্রে ওই বিধি মেনে চলতে হবে। কিন্তু সতর্কবার্তাটি যে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি, ঘটনার পর তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের ধারণা, ইমেইলটি এমন একটি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে, যা চালান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইউপিএস কর্মীরা ব্যবহার করতেন না। অর্থাৎ, সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যাঁদের সেটি জানা সবচেয়ে জরুরি ছিল, তাঁদের কাছে তা পৌঁছেছিল কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

 এফ-৩৫-এর যন্ত্রাংশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

এফ-৩৫ আর দশটা সাধারণ যুদ্ধবিমানের মতো নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলোর অন্যতম। একই সাথে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্র কর্মসূচি। গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে বহু বছর ধরেই এই স্টেলথ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে চীন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দেশটির হাতে পৌঁছানোর ঘটনা ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনে পৌঁছানো এফ-৩৫-এর যন্ত্রাংশগুলোতে রাডার তরঙ্গ শোষণকারী বিশেষ উপাদান ছিল। এই উপাদান বিমানের এমন একটি বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত, যার কারণে শত্রুপক্ষের রাডারে সেটিকে শনাক্ত করা কঠিন হয়।

যন্ত্রাংশগুলো অবশ্য নিয়মিত ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়নি। মে মাসের শেষ দিকে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত পাঠানো হচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, সেগুলো মেরামত করা সম্ভব কি না, অথবা ব্যবহার অনুপযোগী হলে ফেলে দেয়া হবে কি না, তা যাচাই করা।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাব নিরীক্ষা দপ্তরে এফ-৩৫-এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা ডায়ানা মাউরার ব্লুমবার্গকে বলেন, ‘চীনের হাতে এখন এফ-৩৫-এর ককপিটের ঢাকনা রয়েছে—এটা মোটেও ভালো খবর নয়।’

তিনি ঘটনাটিকে ‘বড় ধরনের ব্যাপার’ বলে উল্লেখ করেন। মাউরার বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, চীনারা এতে উল্লাস করেছে। এরপর তারা যন্ত্রাংশগুলো খুঁটিয়ে দেখে সেগুলোর প্রযুক্তি ও কার্যপ্রণালি বোঝার এবং নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে সেগুলোকে মোকাবিলা করা যায়, তা বের করার কাজে নেমেছে। আমার বিশ্বাস, যন্ত্রাংশগুলো হাতে পাওয়ার পর তারা এ কাজই করেছে।’

 পেন্টাগনের ওপর চাপ বাড়ছে

চালান পরিচালনায় গাফিলতির দায় থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করছে পেন্টাগন। একই সাথে তারা জোর দিয়ে বলছে, যন্ত্রাংশগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল।

মার্কিন পরিবহন কমান্ড জানিয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট চালানের পরিবহন কিংবা সমন্বয়ের কাজে তারা জড়িত ছিল না।’

সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য মার্ক ওয়ার্নার এ বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে ব্রিফিং চেয়েছেন। কমিটির চেয়ারম্যান টম কটনও সামরিক সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

উত্তর ডাকোটার সিনেটর কেভিন ক্রেমার প্রশ্ন তুলেছেন, চালানটি অন্য পথে চলে যাওয়া নিছক দুর্ঘটনা ছিল কি না। ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্বে থাকা সশস্ত্র বাহিনী কমিটির একটি উপকমিটির চেয়ারম্যান তিনি।

ক্রেমার প্রশ্ন করেন, ‘চালানটি আটকে নেয়ার পরিকল্পনা কি চীন আগে থেকেই করে রেখেছিল?’

তদন্ত চলছে, যন্ত্রাংশ ফেরানোর চেষ্টা

ঘটনাটি নিয়ে পেন্টাগন ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তদন্ত শুরু করেছে। প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, যন্ত্রাংশগুলো ফিরিয়ে আনা এবং কীভাবে এ ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখার কাজ চলছে।

এক বিবৃতিতে দপ্তরটি বলেছে, ‘যন্ত্রাংশগুলো ফিরিয়ে আনতে, ঘটনাটি তদন্ত করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও শিল্প খাতের অংশীদারদের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করছি।’

ব্লুমবার্গকে এ বিষয়ে অবহিত এক ব্যক্তি জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বরের এক ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরের লজিস্টিকস বিভাগের উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী এরিকা পাথ একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে একটি বিশেষ দল গঠনের কথা জানান।

যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৯টি দেশে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কার্যক্রমের জন্য খুচরা যন্ত্রাংশের বৈশ্বিক মজুত ও সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালনা করে লকহিড মার্টিন। এ ঘটনায় নিজেদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

লকহিড মার্টিন বলেছে, ‘আমরা এককভাবে পরিবহনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিই না।’ প্রতিষ্ঠানটি আরো জানিয়েছে, সরকারি বিধিবিধান মেনে চলে কি না, তা যাচাই করেই পরিবহনসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়।

কোন পরিবহন সহযোগী এ ঘটনায় জড়িত ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সহযোগীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছে তারা।

চালানটি ভুল পথে যাওয়ার বিষয়ে নতুন তথ্য জানতে চাইলে লকহিড মার্টিন বুধবার ব্লুমবার্গকে জানায়, ‘আপনার উল্লেখ করা ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আমাদের নতুন করে কিছু যোগ করার বা সংশোধন করার নেই।’

একটি ইমেইল, একটি সতর্কবার্তা চোখ এড়িয়ে যাওয়া আর শেষ মুহূর্তে চালানের পথ বদল—এই তিনের পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পৌঁছে গেল চীনের হাতে। এখন প্রশ্ন, সেগুলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না। তার আগেই চীন যন্ত্রাংশগুলো পরীক্ষা করে সেগুলোর প্রযুক্তি সম্পর্কে কতটা জানতে পারবে, সেটিও দেখার বিষয়।