
আফ্রিকার সাভানায় নিজেদের নতুন আবাস খুঁজতে বের হয়েছিল তিন সারমেয় ভাই। পথে তাদের এড়িয়ে যেতে হয়েছে গাড়ি, শিকারি ও ফাঁদের মতো নানা বিপদ। আট মাসের সেই দুঃসাহসিক অভিযানে তারা পাড়ি দিয়েছে ২ হাজার ৫০০ মাইলেরও বেশি পথ। আফ্রিকা মহাদেশে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর একক যাত্রার ইতিহাসে দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিলো তারা।
১৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, জাম্বিয়ায় গত বছর এই তিন বিপন্ন আফ্রিকান বুনো কুকুরের নজিরবিহীন যাত্রার তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা। তিন ভাইয়ের এই ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন এলাকা খোঁজার’ যাত্রায় তারা মোট ২ হাজার ৫০০ মাইলের বেশি বা প্রায় ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। বয়স বাড়ার পর তরুণ বুনো কুকুরদের নিজেদের দল ছেড়ে নতুন এলাকা খুঁজে নিতে হয়, যেখানে তারা সঙ্গী পেয়ে নিজেদের পরিবার গড়ে তুলতে পারে।
পশ্চিম জাম্বিয়ার কাফুয়ে জাতীয় উদ্যান থেকে যাত্রা শুরু করে তিন সারমেয় ভাই শেষ পর্যন্ত দেশটির পূর্বাঞ্চলের লুয়াংওয়া উপত্যকায় পৌঁছায়। বাস্তবে এই তিন বুনো কুকুর আড়াই হাজার মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু যাত্রার শুরু ও শেষ গন্তব্যের মধ্যে সরাসরি দূরত্ব ছিল ৩৪০ মাইল বা ৫৪৬ কিলোমিটার। ঘুরপথে চলতে গিয়ে তাদের এত বিশাল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। শুরু ও শেষ গন্তব্যের এই সরাসরি দূরত্বও আফ্রিকান বুনো কুকুরের যাত্রার ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড।
তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার দূরত্ব প্রায় লাটিন আমেরিকার দেশ চিলির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়ে হেঁটে যাওয়ার সমান। এমনকি পূর্ব আফ্রিকার সেরেঙ্গেটিতে বিখ্যাত ওয়াইল্ডবিস্ট ও জেব্রার অভিবাসনের চেয়েও দীর্ঘ। এর আগে আফ্রিকান বুনো কুকুরের দীর্ঘতম যাত্রার রেকর্ড ছিল ২ হাজার ৪১৮ মাইল। ২০১২ সালে তানজানিয়ার উত্তরাঞ্চলের এনগোরোঙ্গোরো জেলার লোলিওন্দো থেকে দক্ষিণ কেনিয়ার সাভো ওয়েস্ট জাতীয় উদ্যান পর্যন্ত গিয়েছিল একদল বুনো কুকুর।
জাম্বিয়ান কার্নিভোর প্রোগ্রামের প্রধান নির্বাহী ড. ম্যাট বেকারের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা এই বুনো কুকুরগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘ইকোলজি’ সাময়িকীতে। বেকার বলেন, ‘এই অসাধারণ যাত্রা দেখিয়ে দেয়, আফ্রিকার বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসগুলোর মধ্যে এখনো প্রাকৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। তবে একই সাথে এটাও স্পষ্ট হয়েছে, এসব পথ পাড়ি দেয়া কতটা কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।’
তিনি বলেন, শুধু বেড়া দিয়ে ঘেরা আলাদা আলাদা সংরক্ষিত এলাকা থাকলেই হবে না। এসব এলাকার মধ্যে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথও খোলা ও নিরাপদ রাখতে হবে। এই গবেষণা এমন সংযুক্ত ভূখণ্ড সংরক্ষণে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। বুনো কুকুরগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, বন্যপ্রাণীর চলাচলের জন্য এই সংযোগ এখনো কাজ করছে। এখন এগুলো রক্ষা ও আরো শক্তিশালী করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
গবেষকেরা মোট ১৯টি আলাদা বুনো কুকুরের দলকে অনুসরণ করেছিলেন। এর মধ্যে তিন ভাইয়ের বোনদের একটি দলও ছিল। তবে ভাইদের মতো সফলভাবে নতুন এলাকা খুঁজে নিতে পারেনি তারা। শেষ পর্যন্ত দুই বোন মারা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, তারা ফাঁদে আটকা পড়ে মারা গেছে। তবে মৃত্যুর আগে ভাইদের সাথে তাদের হয়েছিল এক হৃদয়ছোঁয়া শেষ সাক্ষাৎ।
যাত্রা শুরুর প্রায় দুই মাস পর জাম্বিয়ার তামা-খনি অঞ্চলের গভীরে ভাই-বোনেরা আবার একে অপরের দেখা পায়। পুরো একটি দিন তারা একসাথে কাটায়। এরপর আবার আলাদা পথে চলে যায়। আত্মীয় বুনো কুকুরেরা সাধারণত নতুন পারিবারিক দল গঠন করে না। তাই সম্ভাব্য সঙ্গী খুঁজে পেতে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
আফ্রিকায় এখন প্রায় ৬ হাজার ৬০০টি প্রাপ্তবয়স্ক বুনো কুকুর টিকে আছে। ৩৯টি স্বতন্ত্র জনসংখ্যায় বিভক্ত এই প্রজাতিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক ইউনিয়নের লাল তালিকায় বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। আবাসস্থল হারানো, প্রাকৃতিক শিকারের সংখ্যা কমে যাওয়া, বুশমিট শিকারিদের পাতা ফাঁদ এবং মানুষের সাথে সংঘাত—সবই তাদের টিকে থাকার বড় হুমকি।
তবুও তিন সারমেয় ভাইয়ের এই দীর্ঘ যাত্রা দেখিয়েছে, মানুষের দখলে চলে যাওয়া ভূদৃশ্যের মধ্যেও বিপুল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বুনো কুকুর টিকে থাকতে পারে। আফ্রিকান সাভানা হাতির মতো এই প্রাণীদেরও নতুন আবাস খুঁজতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সুযোগ প্রয়োজন। মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে হাতিদের প্রাচীন অভিবাসন পথও ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কাভাঙ্গো-জাম্বেজি আন্তঃসীমান্ত সংরক্ষণ এলাকার সচিবালয়ের পরিচালক ড. নিয়াম্বে নিয়াম্বে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি এসব গবেষণা বড় বড় ভূদৃশ্যের মধ্যে এখনো যে সংযোগ রয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিচ্ছে।’
কাভাঙ্গো-জাম্বেজি অঞ্চলটি পাঁচটি দেশজুড়ে বিস্তৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ এলাকা। সেখানে সরকারগুলো বন্যপ্রাণীর চলাচলের জন্য ভূদৃশ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
নিয়াম্বে বলেন, ‘আমরা যদি জাতীয় উদ্যান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এলাকা, দেশ ও অঞ্চলজুড়ে থাকা এসব সংযোগ সংরক্ষণ করি এবং আরো উন্নত করি, তাহলে বুনো কুকুরের মতো অনেক প্রজাতিই নিজেদের বাকি কাজটা নিজেরাই করে নিতে পারবে।’







