সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

মানুষ ঋণ করে বাধ্য হয়ে। যখন আর কোনো উপায় থাকে না। কোনো প্রয়োজন মেটানো কিংবা সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য সে এই ঋণের অর্থ কাজে লাগায়। আবার এমন মানুষও আছে যারা নিছক শখ করে ঋণ করে। এর মন্দ ফলও তাদের ভোগ করতে হয়। কখনো এর পরিণতিতে তাদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। সরকারের জন্য ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও দুটো প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকার অনেক ক্ষেত্রে উচ্চভিলাষী প্রকল্পে বিদেশী ঋণ গ্রহণ করেছে। তাতে লাভের চেয়ে জনগণের ওপর বেশি দায়ভার চেপেছে। এখন তার নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। 
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১০ বছরে বিদেশী ঋণের বকেয়া তিন গুণ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলার। ১০ বছর আগে যা ছিল তিন হাজার ৮৭৭ কোটি ডলার। দিন যত যাচ্ছে বিদেশী ঋণের স্থিতি বাড়ার এই প্রবণতার গতিও তত বাড়ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সবমিলিয়ে বাংলাদেশ বিদেশী ঋণের বিপরীতে ১১০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। তার ১০ বছর পর ২০২১-২২ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ— ২০১ কোটি ডলার হয়। পরের বছরই তা ২৭৫ কোটি ডলার হয় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেটি আরো বেড়ে হয়ে যায় ৪৫০ কোটি ডলার। হিসাব মতো ১৪ বছরে ঋণ পরিশোধ চার গুণের বেশি হয়েছে। মোট কথা, বেশি হারে ঋণ করার কারণে পরিশোধের হারও বাড়ছে।
বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এখনো ভালো। এমনকি সর্বশেষ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের তুলনায় রফতানি বাণিজ্যের আয় শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তাই বলে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা যুক্তিযুক্ত, এমন বলার অবকাশ অনেক ক্ষেত্রে নেই; বরং কিছু বৈদেশিক ঋণ যদি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার গ্রহণ না করত তাহলে অর্থনীতির জন্য ভালো হতো। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ ছিল বৈদেশিক ঋণ নেয়ার এমন একটি খাত। এটি একটি শ্বেতহস্তী। ব্যয়ের তুলনায় এ থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। এমনকি প্রকল্পটি সাধারণ মানুষের উপকারে আসছে না। কিন্তু এটি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বাড়িয়েছে। রূপপুর পারমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র আরেকটি প্রকল্প যা আরো অনেক কম মূল্যে স্থাপন করা যেত। এখন সেটি কয়েকগুণ বিদেশী ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে। বিগত হসিনা সরকারের সময় কয়েক ডজন মেগা প্রকল্পে বিদেশী ঋণ নেয়া হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে খরচ করা হয়েছে বহু বেশি। একটা শ্রেণীকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দেয়াই ছিল প্রকল্প গ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্য। দুর্নীতিবাজরা এ থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। কিন্তু এ ঋণের বোঝা রয়ে গেছে জনগণের মাথার ওপর। বিদেশী ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য আছে এই যুক্তিতে বড় অঙ্কের বিদেশী ঋণ গ্রহণ করার অবাধ সুযোগ থাকা কোনোভাবে উচিত নয়। ঋণ করে ঘি খেলে তার বাড়তি মূল্য একসময় না একসময় চুকাতেই হবে। সরকারকে তাই ঢালাও বিদেশী ঋণ গ্রহণের সংস্কৃতি থেকে সরতে হবে। জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রকল্পে যতটুকু ঋণ দরকার ততটুকু নিতে হবে। বেপরোয়া বিদেশী ঋণ গ্রহণ করে তার ভার জনগণের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না।

Advertisement