
দেশে মানব পাচারকারীরা যে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, টেকনাফের রঙ্গীখালীতে গত বৃহস্পতিবার তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাবাহিনীর এক সদস্যের প্রাণ হারানোর ঘটনায় তা বুঝা যায়। গহিন পাহাড়ে রোহিঙ্গা ও বাঙালিদের একটি দলকে তারা আটকে রেখেছে; এমন খবরের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনী সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় ১৫-১৬ জনের পাচারকারী দল এলোপাতাড়ি গুলি চালালে সেনাসদস্য তিতাস শেখ গুরুতর আহত হন। তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পাচারকারী চক্র কতটা বেপরোয়া এবং ওই অঞ্চল ঘিরে কেমন শক্তি সঞ্চয় করেছে, তার আলামত পাওয়া গেল এ ঘটনায়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ টিম গঠন করা হয়। তাতে ছিল সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও স্থানীয় পুলিশ। অভিযানস্থলে পৌঁছালে পাচারকারীরা পালানোর বদলে গুলি ছুড়েছে। কোন পরিস্থিতিতে একজন সেনাসদস্য হত্যার শিকার হলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এর আগেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা কর্মকর্তা ও সেনা সদস্যরা নিহত হয়েছেন। ওইসব ঘটনায় দেখা গেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা পাচারকারী চক্র প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে ওঁৎপেতে ছিল। এ ধরনের অভিযানের আগে অপরাধীদের অবস্থান ও তাদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য-উপাত্ত নেয়া হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি টেকনাফের মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা অস্থির অবস্থায় আছে। মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, চোরাকারবারী চক্র নানাবিধ অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তার শিকার হচ্ছেন স্থানীয়দের পাশাপাশি এদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারাও। কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থান পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। রোহিঙ্গা শিবিরে প্রতিনিয়ত দাঙ্গা-হাঙ্গামা রক্তপাত এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। বড় ধরনের অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা শিবির ঘিরে। এর মধ্যে একটি চক্র আছে মানব পাচারের সাথে জড়িত। তারা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের বিভিন্ন রুটে দেশের ভেতরে বাইরে পাচার করে থাকে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে রেহিঙ্গারা বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন। এই অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান নিজ দেশে তাদের নাগরিক অধিকারসহ নিরাপদ প্রত্যর্পণ। সেই উদ্যোগে কোনো অগ্রগতি না থাকায় বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ।
গত এক দশকে শুধু টেকনাফ এলাকা দিয়ে ক্রমাগত মানব পাচারের ঘটনা ঘটেছে। এ পর্যন্ত যত মানব পাচারকারী আটক হয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না। এদের কারণে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিতে গিয়ে বহু রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে। অনেকে গহিন জঙ্গলে নির্দয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন।
রঙ্গীখালীর অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্য ও ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তল বন্দুক ও গুলিও উদ্ধার হয়েছে। ধৃত মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রের বাকি সব সদস্যকে শনাক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








