
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত দিন। সেদিন রাজধানীর পল্টনে প্রকাশ্যে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। লগি-বৈঠা, লাঠি নিয়ে জামায়াত-শিবিরের ওপর পৈশাচিক হামলা চালায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল, হত্যার পর লাশের উপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করার দৃশ্য। মানুষ খুন করে এমন উল্লাস সভ্যসমাজে অকল্পনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছিল। আরো ভয়াবহ বিষয় হলো, এই নির্মমতার যথাযথ বিচার হয়নি। বরং পরবর্তী হাসিনার সময় বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার চরম মূল্য দিতে হয়েছে জাতিকে।
২৮ অক্টোবরকে তাই শুধু একটি দিনের রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই দিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক বিপজ্জনক সংস্কৃতির প্রদর্শন ঘটে, যেখানে ক্ষমতার জন্য মানুষের জীবনও তুচ্ছ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসিকতা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, পল্টনের ঘটনা তারই সাক্ষ্য।
যে পথ খুলে দিয়েছিল এক-এগারোর দরজা
২০০৬ সালের অক্টোবর ছিল রাজনৈতিক সঙ্কটের সময়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছিল। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চলছে তীব্র বিরোধ। এই সঙ্কট সমাধানে রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতা ছিল জরুরি। কিন্তু দুই পক্ষের অনমনীয়তা পরিস্থিতিকে ক্রমেই সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
২৮ অক্টোবর পল্টনে যে রক্তপাত ঘটে, তা ছিল এই রাজনৈতিক সঙ্কটের বীভৎস প্রকাশ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকা অবরোধের আহ্বান এবং সেদিনের সহিংসতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। হামলা, প্রাণহানি, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া সবকিছুরই নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এখানে বিএনপির দায়ও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্কট মোকাবেলায় দলটি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সমঝোতার পরিচয় দিতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও সরকারের ব্যর্থতা ছিল স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান আলোচনার মাধ্যমে না হওয়ায় দেশ গুরুতর অচলাবস্থায় পড়ে। এর পরিণতি আসে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। জারি হয় জরুরি অবস্থা। প্রতিষ্ঠিত হয় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। প্রায় দুই বছর জনগণের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক অধিকার সঙ্কুুচিত থাকে। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা গণতন্ত্রের পথ কঠিন করে তোলে।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল অন্য জায়গায়। রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার না হলে, অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে নিরাপদ বোধ করলে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষতা হারালে সেই অন্যায়ের পরিণতি একদিন আরো ভয়াবহ হয়ে ফিরে আসে।
ক্ষমতায় এসে হাসিনা কোন বাংলাদেশ গড়েছিলেন
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা সরকারের সামনে সুযোগ ছিল গণতন্ত্র শক্তিশালী করার। ২৮ অক্টোবরের মতো সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু হাসিনা ভিন্ন পথ বেছে নেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে থেমে গেলে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই বিচারহীনতা ছিল বিপজ্জনক বার্তা। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্ক থাকলে অপরাধ করেও রেহাই পাওয়া যেতে পারে, এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আইনের শাসনের ন্যূনতম অস্তিত্ব ছিল না। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিয়ে সঙ্কট আরো গভীর হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেয়নি। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে ঘটানো হয় নৈশভোটের নির্বাচন। ২০২৪ সালের নির্বাচনও প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের নাম হয়েছিল আমি, ডামির নির্বাচন।
নির্বাচন যখন জনগণের মতপ্রকাশের বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম থাকে না, তখন গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের পাতায় বেঁচে থাকে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সংসদ দুর্বল হয়। জবাবদিহির জায়গা দখল করে দলীয় আনুগত্য।
গুম, খুন ও ভয়ের রাষ্ট্র
গণতন্ত্রের এই বিপর্যয়ের সাথে যুক্ত হয়েছিল গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ। বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বাধা দেয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো আইন নিয়েও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করা হয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্র যখন নিজেই আইনের সীমা অতিক্রম করে, তখন নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায় থাকে?
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এটি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
এদিকে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, অর্থ পাচার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ নিয়ে প্রশ্ন ক্রমে বেড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প হয়েছে, অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন কি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার বৈধতা দিতে পারে? সেতু, সড়ক কিংবা মেট্রোরেল মানুষের স্বাধীনতার বিকল্প হতে পারে না। উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনও রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
২৮ অক্টোবরের বিচারহীনতা থেকে জুলাই বিস্ফোরণ
এখানেই ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সাথে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গভীর যোগসূত্র। দুটি ঘটনা এক নয়। দুটির তাৎক্ষণিক কারণও আলাদা। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারহীনতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ধারাবাহিকতা বুঝতে হলে এই দুই অধ্যায় পাশাপাশি রাখতে হবে।
২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার হলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সহিংসতা চালিয়ে পার পাওয়া যায়, এমন বার্তা দুর্বল হতে পারত। অপরাধীদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তুলে বিচারের মুখোমুখি করা গেলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ত। কিন্তু বিচারহীনতা বরং রাজনৈতিক দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করেছে।
এরপর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিরোধী দলকে চাপে রাখা এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সঙ্কটের মুখে পড়ে। মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে ক্ষোভ জমে। গুম ও খুনের অভিযোগ মানুষের মনে ভয় তৈরি করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হয়। বহু মানুষ অনুভব করেছেন, রাষ্ট্র তাদের কথা শুনছে না। এই ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে তা জমেছে।
জুলাই ২০২৪-এ সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষের মুখে বৃহত্তর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। আন্দোলনের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরো বিস্ফোরক করে তোলে।
জুলাইয়ের মানুষের ক্ষোভ শুধু একটি নীতির বিরুদ্ধে ছিল না। এর গভীরে ছিল অধিকারহীনতার অভিজ্ঞতা, ভোটের অধিকার নিয়ে হতাশা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভয় এবং জবাবদিহিহীন শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তাকে পালিয়ে ভারতে চলে যেতে হয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা জনরোষের এক ঐতিহাসিক পরিণতি।
যে শাসনব্যবস্থা বিরোধী মতকে উপেক্ষা করে, মানুষের অধিকার সঙ্কুচিত করে এবং রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, সেই ব্যবস্থার স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ২৮ অক্টোবরের রক্তাক্ত স্মৃতি থেকে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাস আমাদের সেই কঠিন সত্যই দেখিয়েছে।
ইতিহাসের বিচার এড়ানো যায় না
২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। সেই ক্ষত মুছে ফেলা যাবে না। আবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শিক্ষা উপেক্ষা করেও সামনে এগোনো যাবে না।
শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্রের বিপর্যয়, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধী মত দমন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সঙ্কটের যে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ অর্জন করেছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। জনগণকে অবজ্ঞা করে কোনো শাসক অনন্তকাল টিকে থাকতে পারেন না।
তবে একটি সরকারের পতনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার হয়, বিরোধী মত দমন করা হয়, দখলদারত্ব ও প্রতিহিংসার রাজনীতি ফিরে আসে, তাহলে ইতিহাসের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
২৮ অক্টোবরের অপরাধের বিচার হতে হবে। গুম, খুন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। অপরাধীকে জবাবদিহি করতে হবে। বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়। রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর আমাদের দেখিয়েছে, বিচারহীনতা কত ভয়াবহ হতে পারে। আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেখিয়েছে মানুষের ক্ষোভকে অনন্তকাল দমিয়ে রাখা যায় না।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই : আমরা কি আবারো ক্ষমতার দম্ভ, দলীয় আনুগত্য ও বিচারহীনতার পথে হাঁটব, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ব, যেখানে মানুষের জীবন, ভোটাধিকার ও মর্যাদা সবার উপরে থাকবে?
জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আর ২৮ অক্টোবরের নিহতদের প্রতি প্রকৃত ন্যায়বিচার হবে সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে শিক্ষা না নিলে সেই ইতিহাসই একদিন আবার আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








