
দেশে টিকাদানে গুরুতর অবনতি ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হামের মতো সংক্রামক রোগের তাণ্ডব তার প্রমাণ। এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ২০০-এর কাছাকাছি। এত দিনে দেশী ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল গঠন করা হয়েছে। দলটি বলেছে, বাংলাদেশের কোনো জাতীয় টিকানীতি নেই। বিশেষজ্ঞ দলটি দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে ইপিআই কর্মসূচিসহ সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা দেখতে পায়। যেমন— ইপিআইয়ে জনবল সঙ্কট। ১৯৮৫ সালের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত জনবলকাঠামোর মধ্যেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। জনবল সঙ্কটের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদানের পরিকল্পনা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা, টিকা সংরক্ষণ ও তদারকি ব্যাহত হয়েছে। কোথাও রোগের প্রাদুর্ভাব হলে তার মোকাবেলায় ইপিআইয়ের প্রস্তুতি ও সাড়া দেয়ার কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা নেই। অথচ একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি ছিল জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন তথা টিকাদান কর্মসূচি।
কয়েক দশক ধরে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে হামসহ একাধিক প্রাণঘাতী রোগ প্রায় নির্মূল করা হয়। প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া সেই হাম হঠাৎ পূর্ণ শক্তিতে ফিরে এসেছে। দেশজুড়ে চালাচ্ছে ভয়াবহ তাণ্ডব। মারা যাচ্ছে শত শত শিশু। এ জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রধানত টিকা সরবরাহের সঙ্কটকে দায়ী করছেন। তবে ইপিআইয়ের সক্ষমতার অভাবই একমাত্র কারণ নয়। মূল কারণ নিহিত সরকারগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনায়। দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম-রুবেলার টিকা থেকে আট লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু বাদ পড়েছে। এতে হাম-রুবেলার সুরক্ষায় বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। একই রকম শূন্যতা তৈরি হয়েছে হুপিংকাশি ও ডিফথেরিয়ার ক্ষেত্রেও।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চ গ্যাভির প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদফতরের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় টিকা কর্মসূচি কিভাবে চলেছে বা চলছে, তারও মূল্যায়ন করেছে। বলা হয়েছে, দুর্বল স্থানীয় পরিকল্পনার কারণে প্রতি বছর টিকা পাওয়ার উপযুক্ত শিশুদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ টিকা পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ দল টিকার কোল্ড চেইনে সমস্যা পেয়েছে। কোনো স্থানে টিটেনাস-ডিফথেরিয়ার (টিডি) টিকা জমাট বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে। কোথাও টিকা ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ার পর্যায়ে দেখা গেছে। টিকা বিতরণের সময় তাপমাত্রা ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। টিকা সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণেও অসঙ্গতি আছে।
যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের নেতৃত্বে আছেন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যবিদ ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার। দলটি আগামী মাসের মাঝামাঝি মতামতসহ লিখিত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। প্রাথমিকভাবে দলটি কিছু স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরামর্শ দিয়েছে; কিন্তু পরামর্শ অনুযায়ী কাজ কতটা হবে সেই প্রশ্ন আছে। টিকার উপযুক্ত প্রতিটি শিশুকে টিকা দিতে হবে। এ জন্য চাই সমন্বিত কর্মসূচি, যেন একটি শিশুরও মৃত্যু না হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








