সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নতুন দাম ৪ অক্টোবর ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে দাম বাড়িয়ে সমন্বয়ের পরও বাজারে এলপিজির সরবরাহ সঙ্কট কাটেনি। বাজারের চিত্র উদ্বেগজনক। এলপিজি সাধারণত রান্নার কাজে ব্যবহার হয়। শিল্প বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতেও এলপিজির ব্যবহার আছে। সাম্প্রতিক সময়ে কখনো স্থিতিশীল মূল্যে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সবসময় বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকছে। এতে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির লক্ষণ স্পষ্ট।
বছরে এলপিজির চাহিদা ১৭-১৮ লাখ টন। আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলিয়ে কাগজে-কলমে কিছুটা ঘাটতি আছে। কিন্তু বাজারে যেভাবে দু®প্রাপ্যতা দেখা যায়; তা অস্বাভাবিক। এলপিজি দেশে ১৫টি প্রতিষ্ঠান আমদানি করে থাকে। কিন্তু দাম নিয়ে এগুলোর মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। উল্টো অশুভ চক্রের ছায়া দেখা যায়। বাজার থেকে সিলিন্ডার একসাথে উধাও হয়ে গেলে ভোক্তাদের মধ্যে হাহাকার পড়ে। এরপর নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হয়। 
গত মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল এক হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরের জন্য সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও বাজারে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৩০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায়। অর্থাৎ সিলিন্ডারপ্রতি ভোক্তাকে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকা। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘরে উনুন জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। 
ভোক্তার পকেট হাতিয়ে অসাধু চক্রের পকেট ভারী করা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। তবে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার ঘিরে যে নজিরবিহীন নৈরাজ্য, তা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন মতে, অনেকে বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁর সস্তা খাবার কিনে খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, জ্বালানির মতো একটি মৌলিক সেবা ঘিরে দেদার লুটপাট চললেও বাজার নজরদারির দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা কার স্বার্থে।
অবস্থাদৃষ্টে এ কথা বলা অযৌক্তিক নয় যে, এই নৈরাজ্যের মূল শিকড় প্রোথিত কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি ও চক্রের হাতবদলের খেলায়। বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো থেকে পরিবেশকদের জন্য লভ্যাংশ নির্দিষ্ট করা থাকলেও, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সম্মিলিতভাবে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অতিরিক্ত দামে এলপি গ্যাস বিক্রির যে অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে আসছে, তা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার নগ্ন উদাহরণ। এতে সহজে অনুমেয়, বাজারে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নেই। তদারকি সংস্থাগুলো মাঝে মধ্যে কিছু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে দায় সারলেও মূল কারসাজির হোতা বা প্রভাবশালী ডিলার গোষ্ঠী বরাবর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক হলো— বিইআরসির শুধু গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে। বাজারে এটি বাস্তবায়িত হলো কি না তার কোনো খবর নেই সংস্থাটির। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার অধিদফতরও ক্রেতার স্বার্থ সংরক্ষণে চরমভাবে উদাসীন। নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও এত টাকা বেশিতে বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর তদারকি ও কঠোর শাস্তির অভাব প্রমাণ করে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। 
জনস্বার্থে জ্বালানি খাতের এমন অরাজকতার অবসান করা জরুরি। শুধু খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা নয়, অসাধু পরিবেশক ও কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টিকারী কোম্পানির বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং লাইসেন্স বাতিলের পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষকে অসহায় করে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর পকেট ভরার এ অনৈতিক উৎসব থামাতে হবে। 

Advertisement