
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য অনন্য অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এটি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের মর্যাদার বিরল স্বীকৃতি। অন্য দিকে বিশ্বনেতাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বিশ্বনেতাদের সাথে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
একই মঞ্চে আছেন নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আফগানিস্তানে জাতিসঙ্ঘ সহায়তা মিশনের প্রধান রাবাব ফাতিমা এবং মানবাধিকারকর্মী ও জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খানের মতো উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ আশার জায়গা। এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশীরাও উদ্দীপ্ত।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই উজ্জ্বল উপস্থিতিকে এখন কৌশলগত অর্জনে পরিণত করতে হবে। হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকা জাহাজগুলো ছাড়ের জন্য ইতোমধ্যে ইরানের সাথে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সাথেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সাইডলাইন বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে মালদ্বীপ ও ভুটানের সাথে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা জটিল। জ্বালানি সঙ্কট, সমুদ্রপথে বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপেক্ষা বিশ্বব্যবস্থাকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, বিশ্বব্যবস্থার সংস্কার ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার মতো ইস্যুতে গঠনমূলক প্রস্তাব ও নেতৃত্ব দিতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসঙ্ঘে রোহিঙ্গা সঙ্কট-বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দফা প্রস্তাব বাস্তবমুখী কূটনৈতিক পদক্ষেপ। গত ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখেরও বেশি আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে; কিন্তু এই মানবিক আতিথেয়তার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্য বাংলাদেশকে একা বহন করতে হচ্ছে। এ দিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ক্রমেই নিষ্ক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। কমে আসছে মানবিক সহায়তা। এই সময় প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন, দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশের একার নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের দায়সারা মনোভাব কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তার পাঁচ দফা প্রস্তাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একটি রোডম্যাপ দিয়েছেন। এতে মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধের কথা আছে। আছে আশ্রিত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সার্বিক স্থিতিশীলতা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে প্রস্তাবগুলো জাতিসঙ্ঘের মূল এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে এই অবস্থানকে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সম্মানজনক অবস্থান আমাদের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি দায়িত্বেরও। বিশ্বজনীন ইস্যুগুলোতে গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে দৃঢ় করবে দেশের বৈশ্বিক অবস্থান ও মর্যাদা।








