সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার
সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার। সংগৃহীত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক আসামিকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেয়ার আশ্বাসে তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে আলোচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার দেশ ছেড়েছেন। গত ৩১ অক্টোবর তিনি ইতালি গেছেন বলে জানা গেছে।

Advertisement

এদিকে সাইমুম রেজার বিদেশ ভ্রমণে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। 

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাইমুম রেজার বিদেশ ভ্রমণের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ফলে তিনি কোথায় যাচ্ছেন বা যাবেন না, সে বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের কিছু করার নেই।

ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া সাবেক এই প্রসিকিউটর ৩১ অক্টোবর ইতালি চলে গেছেন। তার বিরুদ্ধে গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি আট মাসেও প্রতিবেদন দিতে পারেনি, নাকি তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে?

জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, এর কোনোটিই নয়। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির কার্যক্রম চলছে এবং তা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তারা প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছেন।

তিনি বলেন, সাইমুম রেজার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করেছেন। তিনি চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে যোগদানের এক মাসের মধ্যেই সাইমুমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে তার বিদেশযাত্রায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

একপর্যায়ে সাংবাদিকেরা জানতে চান, চিফ প্রসিকিউটর এর আগে সাক্ষাৎকারে সাইমুমের ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে আট মাসেও কেন বিষয়টি ফৌজদারি প্রক্রিয়ায় নেয়া হয়নি?

জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ঘুষ চাওয়া ও দেয়া—দু’টিই অপরাধ। যারা সাইমুমকে ঘুষ দেয়ার প্রস্তাব করেছিল, তারাও সমভাবে দায়ী। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির একজন সদস্য দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তিনি নিজেও কিছুদিন বিদেশে ছিলেন। অন্য প্রসিকিউটরদের একজনের মা মারা যাওয়ায় তিনিও দীর্ঘদিন দায়িত্বে ছিলেন না। এসব কারণে প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়েছে। কমিটি যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন দেবে।

এর আগে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেফতার হন সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। তাকে জামিনে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চান তৎকালীন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার।

এর আগের দিন, ৯ মার্চ, পদত্যাগ করেন সাইমুম রেজা। ওই দিনই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

এর আগে ৯ মার্চ রাতে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেল ফজলে করিমের স্ত্রী ও সাইমুম রেজার কথোপকথনের একটি অডিও প্রকাশ করে। ওই অডিওতে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আলোচনা এবং মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা পেতে বিএনপির এক সংসদ সদস্য ও এক প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে তদবির করানোর পরামর্শ শোনা যায়। ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটরের সমর্থন আদায়েও ওই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কাজে লাগবে বলে কথোপকথনে উল্লেখ করা হয়।

তবে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের ফেসবুক পোস্টে সাইমুম রেজা দাবি করেন, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।

গত ২১ এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি সাইমুম রেজার ঘুষ চাওয়ার অডিওর সত্যতা পেয়েছে। তিনি বলেন, অডিওতে সাইমুম রেজা ও ফজলে করিমের স্ত্রীর কথোপকথন রয়েছে। তবে এর বাইরে তাদের মধ্যে কোনো লেনদেন হয়েছে কি না, তা তখনও খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে পরে আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর প্রসিকিউটর হিসেবে যোগ দেন সাইমুম রেজা তালুকদার। রামপুরা, লক্ষ্মীপুর ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের কয়েকটি মামলা পরিচালনা করেছেন তিনি। প্রসিকিউটর হওয়ার আগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এই আইনজীবী।

গত ৯ মার্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করেন সাইমুম রেজা। সেদিন তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন। ওই দিন ছিল তার শেষ কর্মদিবস। আগের পেশায় ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার পদত্যাগপত্র আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান চিফ প্রসিকিউটর।

এদিকে, সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেফতারের তথ্য জানায় পুলিশ। প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ নয়জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।