সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় । ছবি: নয়া দিগন্ত

 

বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সাফল্য ধান গবেষণায়। স্বাধীনতার পর যে বাংলাদেশ চরম খাদ্য ঘাটতিতে ছিল, সেই দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী। আমাদের দু’টি জনপদ- চলনবিল ও হাওরাঞ্চল দেশের শস্যভাণ্ডার। এখানকার ধান আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায় বিশেষ অবদান রাখে। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টনের বেশি ধান উৎপাদিত হয়। বিবিএস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট ধানের চাহিদার ১৬ থেকে ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। অন্যদিকে চলনবিল অঞ্চলে শুধু বোরো মৌসুমে প্রতি বছর কমপক্ষে দুই লাখ ৫০ হাজার টন (আড়াই লাখ টন) থেকে তিন লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। 
হাওরের ধান উৎপাদনে একটি বিপত্তি প্রতি বছর কৃষকদের তাড়া করে।  সেটি হলো আগাম বন্যা বা আকস্মিক ঢলের পানিতে বিস্তৃত জমির ধান তলিয়ে যাওয়া। এজন্য কৃষিবিজ্ঞানীরা হাওরাঞ্চলের উপযোগী আগাম ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। আশা করা যাচ্ছে, এখানকার কৃষকরা বন্যায় ধান ডুবে যাওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন নিয়মিত ঘটনায় রূপ নিয়েছে। বিগত রবি মৌসুমেও হাওরের ৫৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান বিনষ্ট হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় আড়াই লাখ কৃষক। দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তার প্রায় ১৬ শতাংশ যেখানে হাওরের বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে উপর্যুপরি ক্ষয়ক্ষতি জাতীয় অর্থনীতিতে বড় উদ্বেগের কারণ। 
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন ‘ব্রি ধান-১১৮’-এর বীজ উৎপাদনে সাফল্য হাওরবাসীর জন্য এক আশাব্যঞ্জক বার্তা। 
শৈত্যপ্রবাহে সাধারণত বোরো ধান রোপণে বিলম্ব হয়; যার ফলে ফসল কাটার সময়ও মে-জুন মাস পর্যন্ত পিছিয়ে পাহাড়ি ঢলের কবলে পড়ে। নতুন উদ্ভাবিত জাতটি নিম্ন তাপমাত্রা (২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) সহ্য করতে সক্ষম। এছাড়া বীজ বপন থেকে শুরু করে ১৪৫-১৪৮ দিনের মধ্যে কাটা যায়। ফলে এপ্রিলে কৃষকরা ফসল গোলায় তুলতে পারবেন। ফলে উজানের আকস্মিক ঢল আসার আগে পাকা ধান কেটে নিতে পারবেন কৃষকরা। ফলে কষকের ফসল মার  যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। 
অবশ্য উদ্ভাবনই শেষ কথা নয়। এর সুফল মাঠ পর্যন্ত দ্রুত সঠিকভাবে পৌঁছানোই আসল কথা। এ জন্য সময়মতো মানসম্পন্ন বীজের জোগান, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করার ওপর এর সাফল্য নির্ভর করছে।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের ধান উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়াতে ব্রির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘ব্রি ধান-১১৮’-এর মতো সময়োপযোগী ও জলবায়ু-সহনশীল জাত দ্রুত হাওরের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া গেলে পাহাড়ি ঢলের অভিশাপ থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে। আমরা আশা করি, সরকার ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত পদক্ষেপে দ্রুত হাওরাঞ্চলের জলবায়ু-ঝুঁকি কাটিয়ে এক নতুন কৃষি বিপ্লবের সূচনা করতে পারবে।