
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালা থেকে ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সরিয়ে ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলে দেয়ার দৃশ্য নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় চলছে। লক্ষণীয় যে, ‘আদুভাই’ বলে কথিত শুভ্র চুলের ছাত্রটির সাথে আর কাউকে দেখা যায়নি। পরবর্তীতে আরো একটু এগিয়ে কারা যেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি সিঁড়ির মেঝেতে লাগিয়ে পদদলিত করার ব্যবস্থা করে। অবশ্য দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা সে সব ছবি পদদলিত না করে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, যারা এসব উগ্রবাদী কাজ করেছে তাদের সমর্থক সংখ্যা নগণ্য। তবে এরা এমন আচরণ করলেও বাংলাদেশের জনগণের জন্য দারুণ একটি উপকার করেছে। সেটি হচ্ছে— ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের সংগ্রামের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে আবার দৃশ্যপটে নিয়ে এসেছে।
১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশ আলাদা দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ইতিহাসের বহু অধ্যায় চেপে রাখা হয়েছিল। মনে হতো, ১৯৭১ সালের আগের কোনো গৌরবময় ইতিহাস আমাদের নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর মিডিয়ায় জিন্নাহ, দ্বিজাতিতত্ত্ব, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সৃষ্টি— এসব বিষয় নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় আলোচনা চলছে। সবাই এখন জিন্নাহ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। মানুষ তার আচরণের প্রতিফল কী হতে পারে তা অনেক সময় আন্দাজ করতে পারে না। যেমন— শেখ হাসিনা বুঝতে পারেননি যে, ‘রাজাকার’ গালিটি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। ঠিক তেমনিভাবে এসব অপরিণামদর্শী যুবকের অজ্ঞতা ও সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সবাইকে বিস্মিত করেছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার পেছনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আবেগ অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। তার ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা এবং তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যর্থতা ও পরাজয় বলে আখ্যায়িত করেন। তার মানে দাঁড়ায়, এদেশে আমাদের পূর্বপুরুষ তথা যেসব নেতা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় লড়াই করেছিলেন, তারা সবাই ভুল করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এদেশের বরেণ্য নেতা নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম নেতাদের আমন্ত্রণ করে ‘মুসলিম লীগ’ গঠন করেছিলেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবক ছিলেন। এছাড়া খাজা নাজিমুদ্দীন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী এবং আরো অনেক মুসলিম নেতা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সুদীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছিলেন। এমনকি তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানও একই উদ্দেশ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। উল্লিখিত বরেণ্য নেতাদের কেউ বা শেখ মুজিবুর রহমান নিজে কখনো দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যর্থতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। আওয়ামী লীগ নেতারা দ্বিজাতিতত্ত্বকে যে ভুল বা ব্যর্থ বলে অভিহিত করছেন তার মানে কি এটি দাঁড়ায় না যে, তাদের নেতাদের রাজনীতির সূচনা হয়েছিল ভুল তত্ত্ব¡ দিয়ে? আবার এটিও কি সত্য নয় যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমারেখা নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিজাতিতত্ত্ব¡ যদি ভুল ও ব্যর্থ হয়ে থাকে এবং ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রই যদি একমাত্র সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে ভারতের পশ্চিম বাংলা কেন বাংলাদেশের সাথে যোগ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না?
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বকে কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণা বলে প্রত্যাখ্যান করতে চান। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যা বলেছিলেন তা জিন্নাহর ধারণার প্রতিধ্বনি। তিনি বলেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে একটি সত্য পার্থক্য আছে তাহা ফাঁকি দিয়া উড়াইয়া দিবার জো নাই। প্রয়োজন সাধনের আগ্রহবশত সেই পার্থক্যকে যদি আমরা না মানি তবে সেও আমাদের প্রয়োজন মানিবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবার আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে। আমরা যে কেবল স্বতন্ত্র তাহা নয়। আমরা বিরুদ্ধ।’ ১৯১৭ সালে প্রকাশিত তার ‘কালান্তর’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রবন্ধে এই কথা লিখেছিলেন তিনি।
জিন্নাহ যখন দ্বিজাতিতত্ত্বে¡র কথা বলেন তার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা দরকার। এ প্রসঙ্গে লেখক সুরজিত দাশগুপ্ত বলেন, ‘ভারতবর্ষের বিশেষ পরিস্থিতিতে-যেখানে ধর্মীয় বিচার-বিশ্বাসের ভিত্তির ওপরে রাজনৈতিক উপায়-উদ্দেশ্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের সহজ ও সরল অর্থই হলো— হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শাসন।’ তিনি আরো বলেন, ‘স্পষ্টতই সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়রূপে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শাসন সম্বন্ধে জিন্নাহর মনে গভীর শঙ্কা জেগেছিল এবং সেই শঙ্কা নিবারণের জন্য তিনি পথ খোঁজা শুরু করেন।’
ওলন্দাজ ঐতিহাসিক উইলেম ভনসেন্ডেল লিখেছেন, ইন মেনি ওয়েস দ্য বাংলাদেশ স্টেট ওয়াজ দ্য পাকিস্তান স্টেট বাই অ্যানাদার নেম। ওলন্দাজ লেখকের কথার প্রতিধ্বনি করে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আবুল মনসুর আহমদ বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙ্গে নাই, দ্বিজাতিতত্ত্বও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর প্রস্তাবমত দুই ‘পাকিস্তান’ হইয়াছে। লাহোর প্রস্তাবে ‘পাকিস্তান’ শব্দটির উল্লেখ নাই, শুধু ‘মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্রের’ উল্লেখ আছে। তার মানে রাষ্ট্র নাম পরে জনগণের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়ার কথা। পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্রের নাম রেখেছে ‘পাকিস্তান’। আমরা পুরবীরা রাখিয়াছি ‘বাংলাদেশ’। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই।” (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)
বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ তাদের জীবনধারায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। এমনকি রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইসলামের বিরাট প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। পক্ষান্তরে, পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের জীবনধারা ভিন্নভাবে প্রবাহিত। তারা সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক স্রোতে হারিয়ে গিয়ে একটি ক্ষুদ্র প্রাদেশিক রাজ্যের নাগরিক হতে তাদের আপত্তি নেই; বরং তাতে তারা গৌরববোধ করে। তাদের জীবনধারায় হিন্দুধর্মের বিরাট প্রভাবও অত্যন্ত বাস্তব। সুতরাং এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় বাঙালি জাতি বাস করলেও তাদের দেশপ্রেম, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, আনুগত্য, স্বপ্ন, গৌরবরোধের চেতনাটি সম্পূর্ণ আলাদা।
ফাহমিদ-উর-রহমান তার গ্রন্থে একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৪ সালের কথা। অন্নদাশঙ্কর রায় ঢাকায় এসে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকালে শেখ মুজিব তাকে অকপটে বলেছিলেন, এখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। পশ্চিম বাংলা ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের সাথে মিলে একটি অখণ্ড অবিভাজ্য বাঙালিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এর উত্তরে অন্নদাশঙ্কর রায় তখন মুখে কিছু বলেননি। কিন্তু কলকাতায় ফিরে তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেন। এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে— ‘পাহাড়ে ঘেরা হিমাচল, কৃষ্ণা-কাবেরী, কাঞ্চনজঙ্ঘা, কন্যাকুমারিকা, ইলোরা, অজন্তা, বেনারস, হরিদ্বার কত কিছু নিয়ে বিশাল ভারতবর্ষের যে পরাক্রান্ত বৈভ ও মহিমা, যে ভৌগোলিক ঐশ্বর্য ও বিস্তার তাকে স্বেচ্ছায় বিদায় জানিয়ে জনগড়ের মোয়, বর্ধমানের মিহিদানা, নবদ্বীপ আর গেরুয়া মাটির বোলপুরের জন্য বিচ্ছিন্নতার কথা চিন্তা করাও কি সম্ভব না সঙ্গত? অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাঙালিপ্রেম ভারতপ্রেমকে ছাড়িয়ে উপরে উঠতে পারেনি।’ (ফাহমিদ-উর-রহমান, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মুগ্ধ ও মুক্ত দৃষ্টিতে)
সাহিত্যিক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ১৯৬৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘পূর্ববঙ্গের সমস্যা’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ নিবন্ধ পাঁচ কিস্তিতে ছাপা হয়। তাতে তিনি পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের একটি জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি যা বলেছিলেন তার একটি অংশ হচ্ছে নিম্নরূপ :
‘দুঃখের বিষয়, আজো এমন সব বাঙালি আছেন যারা মনে করেন ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলিম দুটি সমাজ নয়, এমনকি হিন্দু বা মুসলিম বলিয়া কোনো সমাজই নাই, আছে শুধু ভারতীয় সমাজ। হিন্দু হিন্দু, মুসলমান মুসলমান, এই কথাটি সহজ সরল মনে, সহজভাবে স্বীকার না করিবার ফলে স্বাধীনতার প্রাক্কালে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের রূপ বাস্তবক্ষেত্রে এমন দাঁড়াইল যে, তখন ছাড়াছাড়ি ভিন্ন আর কোনো পথ দেখা গেল না। ... ধরিয়াই লওয়া যাক যে, পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি এতটুকু আছে যে, তাহার পক্ষে স্বাধীন হওয়া সম্ভব। যদি স্বাধীন হয়ই, তাহা হইলে স্বাধীন বাঙালি মুসলমান কি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর সহিত যুক্ত হইবে? বর্তমান অবস্থায় যুক্ত হইবার অর্থ শুধু পশ্চিমবঙ্গের সহিত যুক্ত হওয়া নয়, ভারতবর্ষেরও অন্তর্ভুক্ত হওয়া। ইহার স্পষ্ট উত্তর, কখনো নয়। পাকিস্তানের সহিত বিমুক্ত হইয়া পশ্চিমবঙ্গের সহিত ভারতবর্ষভুক্ত হইবার আগ্রহ কোনো মুসলমানের নাই এবং হইতে পারে না। তাহা হইলে বাংলাদেশকে ভাগ করিয়া পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি হইয়াছিল এবং যাহার জন্য পূর্ববঙ্গের সহিত পাকিস্তানের বিরোধ, সেই উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হইবে।
এই উদ্দেশ্য বাঙালি মুসলমানের বিশিষ্ট জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি বজায় রাখিয়া উহার বিকাশ সাধন। এই উদ্দেশ্যের পথে পাকিস্তানের হইতে পূর্ববঙ্গের যে বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তাহা হইতে অনেক বেশি বিপদের আশঙ্কা ভারতবর্ষের দিক হইতে। ... মুসলমানের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতির যে বৈশিষ্ট্য আছে, তাহার বেলাতে হিন্দুস্তানি প্রধান ভারতবর্ষ কী মূর্তি ধারণ করবে, তাহা মুসলমানের পক্ষে অনুমান করা কঠির নহে। গো হত্যা, আমিষ ভোজন ইত্যাদি ব্যাপারে হিন্দুস্তানি হিন্দুর গোঁড়ামি বাড়িয়া চলিয়াছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। তাহা ছাড়া পূর্ববঙ্গের মুসলমানের এইটুকু বুঝিতে কোনো অসুবিধা নাই যে, ভারতবর্ষ বর্তমানে তাহাদের প্রতি যে সমবেদনা দেখাইতেছে, উহা আসলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধাচরণ, তাহাদের প্রতি করূণা, ভালোবাসা বা সহযোগিতা নহে। বর্তমানে পূর্ববঙ্গে মুসলমানের যে প্রাধান্য আছে, তাহা ভারতবর্ষে আসিয়া উহারা হারাইবে কেন?
ভারতবর্ষ হইতে ভয় ছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর মনোভাব সম্পর্কেও পূর্ববঙ্গের মুসলমান নিশ্চিন্ত নহে। স্বীকার করিতেই হইবে, দুই বাংলার মধ্যে এখন যথেষ্ট বিরুদ্ধভাব বিদ্যমান। হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষের কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত পূর্বকার ও বঙ্গবিভাগপ্রসূত অভিযোগ ভোলে নাই। পূর্ববঙ্গ হইতে যে সকল মধ্যবিত্ত হিন্দু বিতাড়িত হইয়াছে, তাহাদের ঘরবাড়ি, ধনসম্পত্তি হারাইবার শোক ও ক্রোধ এখনো শান্ত হয় নাই। এত শীঘ্র হইবারও নহে। অপরপক্ষে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষক বহুকাল ধরিয়া হিন্দু মহাজন জমিদারের শোষণ হইতে দুঃখকষ্ট পাইয়াছে, তাহার স্মৃতিও লোপ হয় নাই। সুতরাং দুই পক্ষের কোনো পক্ষই অতীত ভুলিয়া ভাই ভাই হইবার মতো মানসিক স্থৈর্য ফিরিয়া পায় নাই।’
নীরদ চৌধুরীর মন্তব্য সম্পর্কে গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘লেখক নীরদ চৌধুরী বাঙালির (হিন্দু ও মুসলমান উভয়) মনস্তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। এ জন্য মুসলিম লীগের সভাপতি ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ করার প্রয়োজন নেই।’ (মহিউদ্দিন)
স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বঙ্গ ও আসাম নামে একটি প্রদেশ গঠন করে ঢাকাকে রাজধানী করলে পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু বাঙালিরা তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। তাদের আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে তা বাতিল করে। এমনি, পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানালে তারা তারও বিরোধিতা করে। আবার ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময়ে বাংলাকে ভাগ করতে পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু বাঙালিরাই গোঁ ধরেছিল। সুতরাং জাতীয়তার চেতনা ও আবেগ সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়।
স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা এই এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের যুগ-যুগব্যাপী সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাঞ্জাবের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে; নিজেদের মুসলিম স্বাতন্ত্র্য চেতনার বিরুদ্ধে নয়। বাংলার শতবর্ষব্যাপী মুসলিম জাগরণের দীর্ঘ সংগ্রামী গতিধারা থেকে মুক্তিযুদ্ধকে তাই বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
কোনো কোনো মহলের ‘হাজার বছর পরে বাংলাদেশ এই প্রথম স্বাধীন হয়েছে’ বলে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চলে, তার জবাবে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘ইংরাজ আমলের ২০০ বছর বাংলাদেশ ছিল কলকাতার হিন্টারল্যান্ড। কাঁচামাল সরবরাহের খামারবাড়ি। ২৫ বছরের পাকিস্তান আমলে এই খামারে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও কিছু শিল্প বাণিজ্য গড়িয়া উঠিয়াছে...। ইংরাজ আমলের ২০০ বছর বাঙালি মুসলমানদের অন্ধকার যুগ। ... কিন্তু ইংরাজ আমলের আগের ৪০০ বছর বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। সেখানেও তাদের রূপ বাঙালি রূপ। সেই রূপেই তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সৃষ্টি করিয়াছে। সেই রূপেই বাংলার স্বাধীনতার জন্য দিল্লির মুসলিম সম্রাটের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছে। সেই রূপেই বাংলার বারভূঁইয়া স্বাধীন বাংলা যুক্তরাষ্ট্র গঠন করিয়াছিলেন। এই যুগ বাংলার মুসলমানদের রাষ্ট্রিক, ভাষিক, কৃষ্টিক ও সামরিক মনীষা ও বীরত্বের যুগ। সে যুগের সাধনা মুসলিম নেতৃত্বে হইলেও সেটা ছিল উদার অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু-বৌদ্ধরাও তাতে অংশীদার। এ যুগকে পরাধীন বাংলার রূপ দিবার উদ্দেশ্যে ‘হাজার বছর পরে আজ বাংলা স্বাধীন হইয়াছে’ বলিয়া যতই গান গাওয়া স্লোগান দেওয়া হউক, তাতে বাংলাদেশের জনগণকে ভুলান যাইবে না।’
১৯৪৭ সালে জাতি-স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করে যে মানচিত্র তৈরি করা হয়, সে ভূখণ্ড আজ বাংলাদেশ নামে পরিচিত। এ মানচিত্র তথা এই ভূখণ্ডের সংরক্ষণকে আজকের বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের নিরাপত্তায় অপরিহার্য বিবেচনা করেন। এ ভূখণ্ড ঘিরে তাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের সংগ্রাম। আর এ ভূখণ্ডের মানুষের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে তাদের হাজার বছরের সংগ্রামী ঐতিহ্যে লালিত সুচিহ্নিত জীবনদৃষ্টির ভিত্তিতে। সে জীবনদৃষ্টির নাম ইসলাম। ইসলাম জীবনদৃষ্টি এ এলাকার মানুষের যে সত্তা নির্মাণ করেছে, সেই সত্তাকে অবলম্বন করে বিকশিত হয়েছে আমাদের রাষ্ট্রসত্তা। এই আত্মপরিচয়, ভাব ও গৌরব নিয়েই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই আত্মপরিচয়, ভাব ও গৌরব আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তি। আমাদের জাতিসত্তার এ ভিত যতদিন অটুট থাকবে, আমরা আমাদের স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ, গৌরবদীপ্ত অস্তিত্ব ততদিন অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হব।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
ayubmiah@gmail.com







