কাজে ফিরছেন পোশাকশ্রমিকরা
কাজে ফিরছেন পোশাকশ্রমিকরা। নয়া দিগন্ত

টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও সঙ্ঘাতের অস্থিরতা কাটিয়ে আবারো কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর কারখানার প্রবেশপথ, কর্মব্যস্ততায় ফিরেছে উৎপাদন লাইন, সচল হয়েছে শিল্পকারখানার চাকা। পাশাপাশি মহাসড়কেও ফিরেছে স্বাভাবিক যান চলাচল।

Advertisement

মজুরি বৃদ্ধির সুপারিশে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সম্মতি এবং নতুন মজুরি কার্যকরের সময়সূচি ঘোষণার পর কর্মস্থলে ফিরেছেন শ্রমিকরা। সব মিলিয়ে দীর্ঘ উত্তেজনার পর গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ফিরেছে স্বস্তি ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ।

রোববার (৮ নভেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, শফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, বাসন সড়ক, টঙ্গী, সালনা ও বাংলাবাজারসহ শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেন শ্রমিকরা।

Advertisement

এদিন কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মতৎপরতা দেখা যায়। কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শ্রমিকদের উপস্থিতিতে উৎপাদন কার্যক্রমও পুরোদমে চলতে দেখা গেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের কাজে ফেরা শুধু কারখানার উৎপাদন সচল রাখার বিষয় নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে লাখো শ্রমিকের জীবিকা, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতের স্থিতিশীলতা। কয়েক দিনের অস্থিরতায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরায় তা অনেকটাই কেটে গেছে।

সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সম্মতি এবং তা বাস্তবায়নের ঘোষণায় শ্রমিকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, নতুন মজুরি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন পাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শ্রমিকরা।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সকাল থেকে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শ্রমিকরা যথারীতি কাজে যোগ দিয়েছেন। শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে শিল্প পুলিশের সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) মো: সোহেল রানা জানান, সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারসহ মোট ২১ প্লাটুন সদস্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি শিল্প পুলিশ, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশের সদস্যরা মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি আরো জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি নাশকতায় ইন্দনদাতা ও জড়িত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক মহলের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

উল্লেখ্য, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কিছু কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। আন্দোলনের মধ্যে বাংলাবাজার এলাকায় বিক্ষোভের ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে।

তবে মজুরি বৃদ্ধির সুপারিশে মালিক-শ্রমিকের সম্মতি এবং নতুন মজুরি কার্যকরের সময়সূচি ঘোষণার পর পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন, কারখানায় উৎপাদন চলছে, স্বাভাবিক হয়েছে সড়ক যোগাযোগ। 

শ্রমিকদের ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণ, মালিকপক্ষের সহযোগিতা এবং প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত থাকলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।