
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনায় শিল্প পুলিশ ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে পাঁচ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ৭০ জনকে।
গ্রেফতারকৃতদের দলীয় পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই চলছে। এছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে আন্দোলনের সময় ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন।
নাশকতার মামলা ও গ্রেফতার পরিস্থিতি
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২ গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আজাদ হোসাইন জানান, তাদের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে পাঁচ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ৪২ জনকে। তাদের দলীয় পরিচয় ও ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। আগে থেকেই ৮-১০ টি কারখানা পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বাকি সব কারখানা চালু রয়েছে।
অন্যদিকে গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত নয়টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই চলছে বলে জানিয়েছেন জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, নাশকতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আরো কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
শ্রমিক তৌফিক হত্যা ও পরিবারের দীর্ঘশ্বাস
আন্দোলনের সময় ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
জয়দেবপুর থানার ওসি আল মামুন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ দেয়নি, পুলিশের পক্ষ থেকেও এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে নিহত তৌফিক শেখের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জিএমপি ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে এবং তৌফিকের ওপর হামলায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) গাজীপুরের বাংলা বাজার এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের সময় একটি কারখানায় ভাঙচুরের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন ২১ বছর বয়সী তৌফিক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী তার ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। বাবার মৃত্যুর পর পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে আসেন তিনি। এক বন্ধুর মাধ্যমে লায়লা গার্মেন্টসে চাকরি নেন। বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
নাশকতার ঘটনায় একাধিক মামলা হলেও তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা না হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গুজবের অভিযোগ
আন্দোলন ও সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে গাজীপুরে অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। তাদের ক্যামেরা ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সাংবাদিক ছাড়াও সাধারণ মানুষ ছবি-ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় সাংবাদিক নেতারা উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, ‘গার্মেন্টস শ্রমিক গাজীপুর’ নামের ফেসবুক গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে-বেনামে অ্যাকাউন্ট ও গ্রুপ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শ্রমিকদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মালিকপক্ষের বক্তব্য ও আহ্বান
শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাদমা গ্রুপের পরিচালক এইচ এম শাকোত ইমরান।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। শ্রমিকদের দাবির প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল। সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধি রয়েছেন। বোর্ড সম্মিলিতভাবে যে মজুরি নির্ধারণ করবে, তারা তা মেনে নেবেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা কর্মবিরতির অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, দোকানপাটে আগুন দেয়া কিংবা যানবাহন ভাঙচুর শ্রমিকদের কাজ হতে পারে না। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তার অভিযোগ, সাদমা গ্রুপের কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিলেও বাইরে থেকে ফোন আসার পর তাদের কেউ কেউ বেরিয়ে যান। অন্য কারখানার লোকজন এসে হামলা ও ভাঙচুরের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে।
শাকোত ইমরান বলেন, ‘শ্রমিক বাঁচলে আমি বাঁচব, শ্রমিক বাঁচলে আমার ফ্যাক্টরি বাঁচবে, আমার ফ্যাক্টরি বাঁচলে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল হবে।’ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কারখানার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন তিনি। একই সাথে শ্রমিকদের ধৈর্য ধরে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








