
যশোরের চৌগাছা উপজেলায় গড়ে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের উপস্থিতি বিদ্যমান। পানির ক্ষেত্রে আর্সেনিকের ভয়াবহতার জন্য প্রতিনিয়ত চলছে গবেষণা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানব দেহের জন্য আর্সেনিকের সর্ব্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার পানিতে। বাংলাদেশে পানিতে সরকারি মানদন্ডে ০.০৫ মিলিগ্রাম সহনীয় মাত্রা ধরা হয়। কিন্তু একটি উপজেলার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ধানে সহনশীল মাত্রার চেয়ে অধিক মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ থেকে পরিত্রণের জন্য জাপানের জাইকা ও জেএসটির কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বে-সরকারি সংস্থা এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক সেচ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আর্সেনিক মুক্ত ধান উৎপাদনে বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তথ্য সূত্রে প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা সিএসি (কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন) কর্তৃক ঘোষণা অনুযায়ী ধানের ক্ষেত্রে আর্সেনিকের সহনশীল মাত্রা ধরা হয় ০.৩৫ পিপিএম। যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর না। অথচ এ উপজেলাতে এই মাত্রার চেয়ে অধিক পরিমান আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ৫৬ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, ধান ও ভাতে আর্সেনিকের উপস্থিতি সহনশীল রাখতে সেচ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। তারা থ্রিএফফোরডি (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকদের সচেতন করছেন। এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।
নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান (সানরাইজ) প্রকল্পের অধীনে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জাপানের জাইকা ও জেএসটি (জাপান সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এজেন্সি) এর কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় অত্র উপজেলায় আর্সেনিক সহনশীল মাত্রায় নিরাপদ ধান উৎপাদনে কাজ করছে সংস্থাটি।
উপজেলার ১১ টি ইউনিয়ন ও পৌর সভার বিভিন্ন গ্রামে ১২টি মডেল প্লট তৈরি করা হয়েছে। পৌরসভার হুদোপাড়া, চৌগাছা ইউনিয়নের কয়ারপাড়া, সিংহঝুলী ইউনিয়নের মাজালি, ফুলসারা ইউনিয়নের আড়ারদহ, জগদীশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া, পাতিবিলা ইউনিয়নের সাদিপুর, হাকিমপুর ইউনিয়নের বকশিপুর, নারায়ণপুর ইউনিয়নের নারায়নপুর, স্বরুপদাহ ইউনিয়নের স্বরুপদাহ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর, ধুলিয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া রামভাদ্রপুর ও পাশাপোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের মাঠে ধানে আর্সেনিক প্রতিরোধে প্লট তৈরি করা হয়েছে।
এ সমস্ত প্লটে ১৪৪ জন কৃষক এই কার্যক্রমের সাথে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া প্রত্যেক ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মোট ৬০ জন সেচপাম্প মালিকদের অধীনে তাদের নিজ উদোগে আর্সেনিক মুক্ত ধান উৎপাদনে থ্রিএফফোরডি (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি আগামী ইরি-বোরো মৌসুমে ব্যবহার করবেন। ইতোমধ্যে তাদের সচেতন করার লক্ষ্যে সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
সংস্থার উপজেলা কো-অর্ডিনেটর আমিরুল ইসলাম জানান, আমাদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর চাল দিয়ে ভাত খেতে হবে। সে কারনে আর্সেনিক মুক্ত বা সহনশীল মাত্রায় ধান উৎপাদন করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘দু’টি পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা কাজ করছি। তবে মূল বিষয় হচ্ছে ধানের আবাদি জমিতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। এটা করতে কৃষক পদ্ধতি ও ত্রিএফফোরডি চালু করা হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ২০ শতাংশ পানি সাশ্রয় হচ্ছে।’
এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ৮ শতাংশ বেশী ফলন পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান। সংস্থার পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, ইরি-বোরো মৌসুমে উপরিভাগে সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হয়। ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমে গেলে আর্সেনিকের ঘনোত্ব বেড়ে যায়। ফলে ধানে অধিক পরিমান আর্সেনিক থাকার ঝুঁকি থাকে।
আড়ারহদ গ্রামের প্লটের কৃষক ইমদাদুল হক ও মাজালি গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান তপন জানায়, ধানে আর্সেনিক থাকতে পারে তা আগে কখনো ধারনা ছিল না। আমরা ধানের জমিতে যেভাবে পানি দিতাম এখন সেভাবে দিইনা। আমরা থ্রিএফফোরডি (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসাব্বির হুসাইন বলেন, ‘থ্রিএফফোরডি (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি ব্যবহার করলে ভালো ফল পাবেন কৃষক। এই পদ্ধতির মূল কাজ হলো প্রচলিত জলাবদ্ধতার পরিবর্তে তিন দিন জমিতে পানি ধরে রেখে চার দিন শুকানো। এতে মাটির রেডক্স পটেনশিয়াল বেড়ে অক্সিডেটিভ পরিবেশ তৈরি হয়। সেকারণে ধান গাছের আর্সেনিক শোষণ কমে যায়। একই সাথে চালে অজৈব আর্সেনিক মাত্রা উল্লেখযোগভাবে হ্রাস পায়।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী প্রকৌশলী ফেরদৌসী খাতুন জানান, ধান বা চালে আর্সেনিকের বিষয়ে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। তবে পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ আছে। আমরা বর্তমানে ১১টি ইউনিয়নে ৯০ টি অগভীর নলকুপ দিয়েছি। নলকুপ থেকে পানি সংগ্রহ করে আঞ্চলিক পানি পরীক্ষাগারে পাঠাচ্ছি। যেখনে আর্সেনিকের মাত্রা বেশী পাচ্ছি, সেখানে পানি পরিশোধনের ভ্যাসেল দিচ্ছি। তিনি বলেন, ‘অত্র উপজেলা আর্সেনিকের আধিক্য রয়েছে। বিগত রিপোর্টে গড়ে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: আহসানুল মিজান রুমী বলেন, ‘আর্সেনিকের রোগীর সংখ্যা বিষয়ে আপডেট তথ্য নেই। তবে ইতোপূর্বে বিভিন্ন জরিপে আমরা জানতে পারি উপজেলায় আর্সেনিক রোগী রয়েছে প্রায় এক হাজার ৫০০ জন। উপজেলা হাসপাতালে এখনো রোগীরা আসছেন। তাদেরকে নিয়মিত চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রাথমিকভাবে এই রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলে রোগ ভাল হওয়া সম্ভব। এই রোগ অবহেলা করলে জীবন ঝুঁকি হতে পারে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘ধানে আর্সেনিকের বিষয়ে একটি সংস্থা কাজ করছে বলে জেনেছি। এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে এখনো কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণের জন্য অগভীর নলকূপ দেয়া হচ্ছে। নলকূপে আর্সেনিক ধরা পড়লে পানি শোধনে সরকারিভাবে ভ্যাসেল দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন আর্সেনিক সমস্যা এ অঞ্চলে অনেক দিনের। আমরা যে টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করছি, তার অধিকাংশই এখন নিরাপদ নয়। পানি ব্যবহারে আমাদের সতর্ক হতে হবে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








