পদ্মা নদী
অবৈধ বাঁধ। নয়া দিগন্ত

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর বুকে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সঙ্কটে পড়েছেন নদীনির্ভর শত শত জেলে পরিবার। 
ভুক্তভোগীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল বাঁধটি দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দিলেও ১৮ দিনেও কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

Advertisement

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে বাঁধ নির্মাণকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বাঁধ অপসারণের দাবি জানানো জেলেদের প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, উপজেলার চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর চর শালেপুর ও চর মির্জাপুরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে নদীর ওপর আড়াআড়িভাবে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধের সাথে সূক্ষ্ম ফাঁদের জাল ও বাঁশের খাঁচা স্থাপন করে পোনা ও মা মাছ নির্বিচারে আহরণ করা হচ্ছে। এতে নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

Advertisement

ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নদীর জলমহাল দখল ও অবৈধ বাঁধের মাধ্যমে মাছ আহরণ করে আসছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। এ ঘটনায় অভিযোগের তালিকায় হরিরামপুরের সালাম খানের ছেলে সোহেল খান, চর শালেপুরের ওকেল মুন্সির ছেলে আজাহার মুন্সী, ওসমান খালাসীর ছেলে মজেম খালাসী, ঈমান বেপারীর ছেলে সহিদ বেপারী, আনজু মাঝি, জিয়া প্রামাণিক, মুক্তার, দীপু, ফেরদৌস খাঁ এবং সাবেক মৎস্যজীবী সমিতির সেক্রেটারি কাশেম খাঁসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে শাহীন লস্করের নামও রয়েছে।

নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে জীবিকা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। তাদের ভাষ্য, পদ্মা নদীই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু নদীতে মাছের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাছ ধরতে পারছেন না তারা। এতে অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে খাদ্যসঙ্কট। দিন দিন বাড়ছে তাদের আর্থিক দুরবস্থা।

এ অবস্থায় বাঁধ অপসারণ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার দাবিতে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুলের কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি দ্রুত বাঁধটি উচ্ছেদ করে নদীর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।

কিন্তু নির্দেশ দেয়ার পর ১৮ দিন অতিবাহিত হলেও বাঁধ অপসারণে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারীরা। তাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের বিষয়েও তারা কোনো তথ্য পাননি।

বিষয়টি নিয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান জানান, চরভদ্রাসন উপজেলায় ক্যাডার কর্মকর্তা বদলি হয়ে যাওয়ায় পদটি শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, সাবেক উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে বাঁধ অপসারণে বিলম্বের কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুলহাস হোসেন সৌরভের কাছে সংসদ সদস্যের নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ জানতে চাওয়া হলেও তিনি নির্দিষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেননি। তবে আবেদনকারীদের হুমকি দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে, পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং জেলেদের জীবিকা রক্ষায় দ্রুত অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি।