
অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের (বেঙ্গল টাইগার) জন্মের ১৫৩ বছর পার হলেও তার জন্মভবন বা জন্মভিটায় কোনো জাদুঘর গড়ে ওঠেনি। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাকরগঞ্জ জেলার (বর্তমান ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা) সাতুরিয়া মিঞা বাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান নেতা।
তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি একই সময়ে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও একসময় তার ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র, অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
গেজেট নোটিফিকেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
ঐতিহাসিক এই ভবনটিতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এ পর্যন্ত একটি গেজেট প্রজ্ঞাপন ছাড়া বাস্তবমুখী বড় কোনো কাজ করতে পারেনি। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো ভবনটিকে ২০১০ সালের মার্চে প্রত্নসম্পদ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হলেও ভবনটিতে এখনও বসবাস করছেন শেরেবাংলার নানা বাড়ির আত্মীয়রা।
ভবনটি দ্রুত সংরক্ষণ ও জাদুঘর তৈরির জোর দাবি জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন অধ্যাপক, ইতিহাস গবেষক, ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনা আঞ্চলিক প্রধানসহ বিশিষ্টজনরা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের বক্তব্য
ভবনটি নিজেদের অধীনে নিয়ে সংস্কার কেন করা হচ্ছে না জানতে চাইলে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক (খুলনা ও বরিশাল বিভাগ) মো: মহিদুল ইসলাম জানান, শেরেবাংলার জন্মভিটার ভবনটি অধিদফতরের ৫ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। অনেক আগে এটি একবার সংস্কার করা হয়েছিল। বর্তমানে যারা বসবাস করছেন তারা ভূমিটি নিজেদের দাবি করছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে; ভূমির মালিক তারা হলে সরকারি জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। চলতি অর্থবছরেই আঞ্চলিক পরিচালকের উদ্যোগে সংস্কার ও সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন আছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে কাজ শুরু হবে।
গবেষক ও অধ্যাপকদের মতামত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু বলেন, “এনটিক্যুইটি অ্যাক্ট-১৯০৪” এবং “প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণ আইন ১৯৭৬”-এর ১০ ধারা অনুযায়ী কোনো প্রত্নসম্পদ সুরক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ১২ ধারা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় এর মালিকানা। এছাড়া ইউনেস্কোর ধারা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ‘কালচারাল হেরিটেজ’ ঘোষণার পর এর শতভাগ দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ও সরকারের। শেরেবাংলার জন্মভবন এখন পৃথিবীর সম্পদ। শেক্সপিয়ার বা কার্ল মার্ক্সের স্মৃতি বিজড়িত স্থানের মতোই এটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই গল্পকে কেন্দ্র করে এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের জাদুঘর তৈরি করা উচিত।
উল্লেখ্য, শেরেবাংলার পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখারে একটি জাদুঘর থাকলেও ঝালকাঠির রাজাপুরে টিকে থাকা ৩০০ বছরের পুরনো এই জন্মভবনে এখনো পর্যন্ত কোনো জাদুঘর হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনওয়াজ বলেন, ‘ঝালকাঠির রাজাপুরে শেরেবাংলার জন্মভিটা ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাজেট স্বল্পতা ও জনবল সঙ্কটের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর ঝালকাঠি জেলা সেক্রেটারি ও ইতিহাস গবেষক ইসমাঈল মুসাফির বলেন, ‘সেখানে কারা থাকছেন সেটি বড় কথা নয়, তাদের দ্রুত পুনর্বাসন করে হলেও শেরেবাংলার জন্মভবন রক্ষা করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, শেরেবাংলার ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।’
জাবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এই স্থাপত্য রক্ষায় সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয়দেরও বুক দিয়ে আগলে রাখতে সচেতন হতে হবে।
আরেক অধ্যাপক সিকদার জুলকারনাইন বলেন, এই ভবনের সাথে তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে। তাই পাশের জমি অধিগ্রহণ করে অবিলম্বে শেরেবাংলা স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো: মমিন উদ্দিন বলেন, ‘উপমহাদেশের এই শ্রেষ্ঠ নেতার জন্মভবনটি সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর বেশ দেরিতে পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাঠানো হবে, যাতে জমি অধিগ্রহণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর তৈরি করা যায়। ঢাকা-বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও ব্যাপক সম্ভাবনাময়।’
উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশের এই মহান নেতা। ঢাকার দোয়েল চত্বর/হাইকোর্ট সংলগ্ন ‘তিন নেতার মাজারে’ তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








