সার ডিলার নিয়োগ
সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ এর ফেসবুক পোস্ট। নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকার প্রথম আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আবেদনকারীকে ডিলার নিয়োগ দেয়ায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। 

Advertisement

নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি তাকে উৎকোচ দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তার প্রশ্ন—যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ না হয়ে অর্থ ও প্রভাবের কাছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নত হয়েছে কি না?

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমাদের লোকেরা মামলা-হামলা খাবে আর আপনারা পয়সার বিনিময়ে সারের লাইসেন্স দেবেন, তা হবে না।’ 

তিনি আরো অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগে কে কোথা থেকে কত শতাংশ অর্থ নেয়, সে বিষয়ে তিনি অবগত। প্রশাসনের ভেতরে অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তালিকার প্রথমজন বাদ, দ্বিতীয়জন নিয়োগ

সংসদ সদস্যের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরিষা ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের জন্য উপজেলা থেকে জেলায় পাঠানো তালিকায় প্রথম স্থানে ছিলেন জিওস্ট্রাক্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের মালিক তাকলিমা আক্তার। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউর রহমান ভূঁইয়া। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে জিয়া এন্টারপ্রাইজ।

এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্য। তার অভিযোগ, অন্যান্য ক্ষেত্রে তালিকার প্রথম আবেদনকারীকে নিয়োগ দেয়া হলেও সরিষা ইউনিয়নে ব্যতিক্রম ঘটেছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা আবেদনকারীকে নিয়োগ দেয়ার পেছনে কোনো বিশেষ স্বার্থ কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

তবে উৎকোচ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি, মূল্যায়নপ্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা জরুরি।

দায় এড়াচ্ছে প্রশাসন?

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ‘বাদ পড়া আবেদনকারীর নিশ্চয়ই কোনো ঘাটতি ছিল। নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার বাইরে কোনো কিছু করা হয়নি। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ করতেই পারেন।’

অন্যদিকে ঈশ্বরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘দ্বিতীয় আবেদনকারী তার কাছে অভিযোগ করেছিলেন যে প্রথম আবেদনকারীর আয়কর রিটার্ন নেই। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক ছিল।’ 

বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও সংসদ সদস্যকেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

প্রশাসনের বক্তব্যে প্রথম আবেদনকারীর আয়কর রিটার্ন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নিয়োগের মূল্যায়নে কোন কোন শর্ত কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রথম আবেদনকারী অযোগ্য হয়ে থাকলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং দ্বিতীয় আবেদনকারীকে নির্বাচনের ভিত্তি প্রকাশ করলেই বিতর্কের অনেকটা নিষ্পত্তি হতে পারে।

উৎকোচের অভিযোগ অস্বীকার নিয়োগপ্রাপ্তের

ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউর রহমান ভূঁইয়া তার বিরুদ্ধে ওঠা উৎকোচের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। 

তিনি নিজেকে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য পরিচয় দিয়ে বলেন, আবেদন করার পর মুঠোফোনে সংসদ সদস্যের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তবে কাউকে ঘুষ দেননি এবং জেলা প্রশাসনের কারো সাথে যোগাযোগও করেননি বলে দাবি করেন তিনি।

দেড় হাজারের বেশি আবেদন, নিয়োগ ১৫৬ জনের

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২ জন ডিলার নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল। জেলায় এ নিয়োগের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০ আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত নিয়োগ দেয়া হয়।

শুক্রবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অনুমোদিত তালিকায় সরিষা ইউনিয়নে জিয়া এন্টারপ্রাইজের নাম রয়েছে।

স্বচ্ছতা প্রমাণের দায়িত্ব প্রশাসনের

সার কৃষকের উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এ খাতের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তাই কোনোভাবেই হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা অর্থের প্রভাব নয়—যোগ্যতা ও নির্ধারিত নীতিমালাই নিয়োগের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত।

সংসদ সদস্যের অভিযোগ সত্য হলে তা প্রশাসনিক জবাবদিহির গুরুতর প্রশ্ন। আর অভিযোগ অসত্য হলে নথিপত্র ও মূল্যায়নের ভিত্তি প্রকাশ করে সেটিও পরিষ্কার করা প্রশাসনের দায়িত্ব। শুধু ‘নীতিমালার বাইরে কিছু হয়নি’ বললেই জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের অবসান হবে না। প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা।