ঘুষের টাকা হাতে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন
ঘুষের টাকা হাতে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন। ভিডিও থেকে নেয়া

‘পাঁচ কোটি টাকা থেকে আমাকে দুই কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেবো।’— সামনে থাকা এক ব্যক্তিকে এমন কথা বলেন ‎বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‎লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন।

তার এমন কথোপকথনের একটি ভিডিও রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) গভীর রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। যা আজ সোমবার সকাল থেকে টক অব দা লক্ষ্মীপুর হিসেবে সর্বত্র আলোচনা চলছে।

‎ভিডিওর একটি অংশে সামনে থাকা এক ব্যক্তির উদ্দেশে নুরুল আমিনকে বলতে শোনা যায়, ‘এসি স্যার রাজি হয়ে গেছে, কোনো একটা কারণে আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না। ছয় কোটি টাকা তিন গুণ না, আমি দুই কোটি টাকার নিচে নড়ব না। চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হলে যাব। দেখি চেয়ারম্যান কী কয়।’

‎এরপর তিনি আরো বলেন, ‘একটা বিলের জন্য যদি দুই কোটি টাকা নিই, তাহলে চেয়ারম্যান কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? আমাকে জায়গামতো পোস্টিং দেবে।’

ভিডিওতে একটি কাজের ব্যয় এবং এক ব্যক্তি কর্তৃক প্রকল্পের মালামাল আত্মসাতের বিষয়ে কথা বলেন নুরুল আমিন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘সোজা হিসাব, তিন লাখ টাকার ওয়ার্কে মালামাল লাগে ৩০ লাখ টাকা। তাহলে কত কোটি টাকার মাল সে আত্মসাৎ করছে। ওই হিসাব করে দেখা যাবে পাঁচ কোটি টাকার মাল সে আত্মসাৎ করেছে।... পাঁচ কোটি টাকা থেকে আমাকে দুই কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেবো।’

‎তবে ভিডিওটির বক্তব্যের প্রেক্ষাপট কী, সামনে থাকা ব্যক্তি কে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু একটা হাতে নিয়ে সামনে থাকা ব্যক্তিকে নির্বাহী প্রকৌশলী জিজ্ঞাসা করছেন—‘এখানে কত’। জবাবে সামনে থাকা ব্যক্তি বলেন, ‘৩৫ স্যার’। তখন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘হ্যাঁ ৩৫, এক লাখ ৩৫’। তখন সামনে থাকা ব্যক্তি বলেন, ‘আগে দিছিলাম এক লাখ, স্যার’।

এদিকে বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মচারী গোপনে প্রতিবেদককে জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার জন্য অনেক আবেদনপত্র তার অফিসে এক মাস ধরে জমা করে রেখেছে। ঘুষের টাকার জন্য কোনো ফাইল সে (নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন) স্বাক্ষর করছে না।

আরো জানা যায়, নিয়মানুযায়ী কেউ কোনো কাজের জন্য এলে নানা আইন দেখিয়ে কাজ হবে না বলে ফিরিয়ে দেয়া হয়। আর ঘুষ দিলে ওই সব কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়।

‎নাম প্রকাশ না করার শর্তে লক্ষ্মীপুর পিডিবির এক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন বিভিন্ন কাজের বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড় করাতে ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ না দিলে বিল আটকে রাখা, কাজের অনুমোদন না দেয়া কিংবা নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলার কারণে ঠিকাদারদের কেউই তার সাথে বিরোধে যেতে চান না।

‎একজন ঠিকাদার বলেন, বিল পাওয়ার জন্য প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয়। পরে ঘুষের বিষয়ে কথা ওঠে। তার সাথে বিরোধে গেলে কাজ পাওয়া ও বিল ছাড় করানো— দুই ক্ষেত্রেই সমস্যায় পড়তে হয়।

‎অভিযোগ ও ভিডিওর বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের মোবাইলে  একাধিকবার কল করে এবং মেসেজ দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে আজ সোমবার দুপুর ২টার দিকে তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ সময় কার্যালয়ে থাকা পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন সকাল থেকেই কার্যালয়ে আসেননি।

‎জানতে চাইলে পিডিবির কুমিল্লা বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।