
মাহমুদ হাসান পটুয়াখালী
পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে দীর্ঘ ১৮ বছর পর রোগীদের খাবার সরবরাহের ঠিকাদার পরিবর্তন হলেও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কার্যাদেশ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার আলতাফ হোসেন। তার দাবি, খাবার সরবরাহে ৩২ লাখ এবং স্টেশনারি সরবরাহে ছয় লাখ টাকা বেশি দর প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদফতর, জেলা প্রশাসক ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ১১ জুলাই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা রোগীদের খাবার ও স্টেশনারিসহ কয়েকটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করেন। এতে অংশ নিয়ে ১১ আগস্ট আলতাফ হোসেন সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি খাবার সরবরাহে এক কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং স্টেশনারি সরবরাহে ১২ লাখ টাকা দর প্রস্তাব করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, খাবার সরবরাহে এক কোটি ৫৯ লাখ এবং স্টেশনারিতে ১৮ লাখ টাকা প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এতে দুই খাতে মোট ৩৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয়ের প্রশ্ন উঠেছে। তবে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়নি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পথ্য সরবরাহের কার্যাদেশ পান সহিদুল ইসলাম। তিনি পটুয়াখালী পৌর আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক। একই কার্যাদেশের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন একই ঠিকাদারের দায়িত্বে থাকা নিয়ে জেলা প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সমালোচনা, মানববন্ধন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়লেও তাকে সরানো যায়নি।
২০২৪ সালের ১ জুলাই মো: আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি দুদকে অভিযোগ করেন, সহিদুল ইসলাম ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে কোনো কারণ ছাড়াই ১৮ বছর ধরে দরপত্র বন্ধ রাখা হয়েছে। অভিযোগে হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মু. হাসানুজ্জামানকে সহিদুলের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রোগীদের খাবার কম দেয়ার অভিযোগও তোলা হয় তখন।
জানা যায়, সহিদুল ইসলামের দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকার পেছনে রয়েছে একটি মামলা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের কার্যাদেশের ভিত্তিতে তিনি টানা ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত পথ্য সরবরাহ করেন। এ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন দরপত্র আহ্বান করলে সহিদুল ইসলাম তা স্থগিতের দাবিতে পটুয়াখালী সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। মামলাটি এখনো চলমান। তবে আদালত কখনো দরপত্র স্থগিতের আদেশ দেননি।
মামলার নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে শুনানি পিছিয়েছে। ২০১৮ সালে সময়ের আবেদন নাকচ হওয়ার পর বর্ণনা দাখিল হলেও পরবর্তী পাঁচ বছরে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। ২০২৩ সালে ইস্যু গঠনের দিন ধার্য হয়। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কয়েক দফা শুনানি হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট শুনানিতে বিচারক মো: রাসেল মজুমদার নথিপত্রের বিশৃঙ্খলা দেখে নতুন দিন ধার্য করেন। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির শুনানিতে শুধু বাদিপক্ষের আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
মামলায় বাদি সহিদুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত জেনারেল প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ফিরোজ আলম। হাসপাতালের পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন সহিদুলের আপন ভগ্নিপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বাদল এবং তার জুনিয়র আইনজীবী আবুল বাশার। নজরুল ইসলাম বাদল আইনি মতামত দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ স্থগিত রাখার পরামর্শও দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। একই ব্যক্তির দুই ভূমিকায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা ও হিসাবরক্ষক মু. হাসানুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, সরকারি ক্রয়বিধি ২০২৫ অনুযায়ী সব সরকারি দফতরকে ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা নীতিগত অগ্রাধিকার। কেউ বিধি লঙ্ঘন করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।








