নিহত অপ্রতীম
নিহত অপ্রতীম নয়া দিগন্ত

অপ্রতীমের আম্মু, সালাম নেবেন। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে সাহস হচ্ছে না। আল্লাহ আপনার কলিজায় তার রহমতের হাত বুলিয়ে দিন। কাছে যেতে সুযোগ পেলে এখন আপনাকে ঘুমাতে বলতাম। আপনার অনেক ঘুম দরকার। হঠাৎ করে জেগে উঠে অপ্রতীমকে ডেকে বসবেন হয়ত, আবার ভেঙে পড়বেন কান্নায়, তবুও। ঘুমাতে থাকলে অন্তত আপনার মনটা নিজেকে একটু সারায়ে নিবে।

বাড়িতে হয়ত অনেক লোক আসবে এখন, আসছেই কেবল। সবাই না হলেও, বেশিরভাগই আপনার শোক দেখতে আসে জানেন। কতটা কাঁদলেন, কতটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেন। আমি কাউরে দোষ দিই না আপা, মানুষ এমনই। মানুষ যখন ঝগড়া দেখে, চায় যে এইইযযাহ লেগে যাক ফাটাফাটি। যখন ভালোবাসা দেখে, চায় যে আবেগের চূড়ান্তটা সামনেই ঘটে যাক। আবার যখন শোক দেখে, চায় তার সামনে কেউ ভেঙে পড়ুক।

যাই হোক, একটাই কথা আপা। নিজের আবেগ যতটুকু দেখাবেন, ততটুকুই দেখিয়েন। আমার ইচ্ছা করে আপনার সামনে যেন কেউ এখন একটা লোহার দরজা হয়ে দাঁড়ায়, কাছের কেউ। কেউ এসে কান্না দেখতে চাইলে যেন আপনাকে আলাদা করে রাখে। বেশিরভাগ মানুষ শান্তি দেয় না কখনো, মানুষ শুধু মজা দেখতে আসে।

আপা, আমার দুইটা টিনএজ সন্তান। আমাদের বাসায় ওদের বয়স ছয়/সাত না হতেই ওরা ফজরের নামাজ শুদ্ধ পড়ে কিন্তু। অথচ এই এখন এসে দু’জনের রোজ যে কান্ডকীর্তি দেখি, আমার দুনিয়ার কাউকে আর দোষ দিতে ইচ্ছে করে না।

জানবেন, এই যে যারা আপনারে নানা উপদেশ দিচ্ছে তাদের হয় বাচ্চাই নাই, আর না হয় দুধের বাচ্চা কোলে নিয়ে আপনারে টিপস দিচ্ছে। এগুলো কানে নিয়েন না, একদমই না।

অপ্রতীমের আম্মু, আপনার যন্ত্রণা, হাহাকার বোঝার সাধ্য আল্লাহ তো আমাকে দেন নাই। আমি বুঝতে চেয়ে নিজেকে ঠেলেও দিচ্ছি না। একটা কথা শুধু বলতে পারি। আপা, কান্না আসলে পরিষ্কার একটা জায়গায় বা বিছানায়, সিজদায় বা বসেই, আল্লাহকে বইলেন। আল্লাহর সাথে কথা বলতে, কান্না করতে, মনের সব অভিযোগ জানাতে শুরু কইরেন। 

আপা, ওজু করতে হবে তা বলছি না। যখন যে অবস্থায় থাকেন। হয়ত কিছু সাড়া আসবে আপনার মনে। সেটা অনেকগুলো মানুষের দেয়া সান্ত্বনার চেয়ে ভালো লাগতে পারে। আর একটু পরে, কয়েক দিন পার হলে কারুর কাছে গিয়ে মন খুলে কথা বইলেন, প্লিজ। আমরা তো মানুষ, আমাদের মন আছে। মনটারও ডাক্তার, পথ্য লাগে।

আপা, শেষ আবদার। এই দেশে রাষ্ট্র কিচ্ছু করে না, করে তো সরকার। সরকারও খুব সাহায্য আপনাকে করবে বলে মনে হয় না। আছিয়া, রামিসা অথবা তনু, কারুর বাপ-মাকেই করেনি। বড়জোর কোর্টের একটা রায়। আমি চাই, আপনি বের করেন খুঁজে। কে আপনার কলিজাটাকে এমন করে শেষ করে দিয়ে গেল, কেন করল? আমাদের মতো লাখো মায়েদের জন্য আপনার জানাগুলো বইলেন।

আমি আল্লাহকে বলি। তিনি যেন আপনার মনে একটা ছোট্ট বাতাসের মতো শান্তি হয়ে যান। আপা জানেন, বেশিদিন না, আমরা সবাইই তো চলে যাবো। আপনি খুঁজে পাবেন আপনার অপ্রতীমকে, এমনই ছোট্ট হয়েই হয়ত আসবে সামনে। ওরা তো নিষ্পাপ, হয়ত আল্লাহর কাছে আপনার জন্য কত কিছু চাইবে। খুব বেশিদিন না। তদ্দিন আল্লাহ ওর যত্ন নিচ্ছেন। আপনার চেয়ে বেশি ওকে ভালোবাসছেন, আল্লাহ আমাদেরকে যে কারুর চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এই ভরসায়ই তো আমাদের ছোট্ট জীবনটা কেটে যায়। তাই না?

মারদিয়া মমতাজ
সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসন
ফেসবুক পোস্ট (২২ সেপ্টেম্বর)