
চোর সন্দেহে ময়মনসিংহের ভালুকায় এক যুবককে বেঁধে মারধরের পর গুরুতর আহত অবস্থায় গাজীপুরের শ্রীপুরে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে স্থানীয়রা তাকে জীবিত উদ্ধার করলেও কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়। ঘটনার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। বরং ঘটনাটি ভালুকায় শুরু হলেও মৃত্যু শ্রীপুরে হওয়ায় দুই থানার মধ্যে মামলা নেয়ার এখতিয়ার নিয়ে এক ধরনের ঠেলাঠেলি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহত যুবকের নাম সুজন মিয়া (৩৫)। তিনি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ভেলুয়া বাজারসংলগ্ন এলাকার আমিনুল হক কালুর ছেলে। তিনি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার পাড়ায় ভাড়া থাকতেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ভালুকার জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় ‘মুরাদ ইলেকট্রনিকস’ নামের একটি দোকানে চুরি হয়। এরপর চুরির সাথে জড়িত সন্দেহে সুজনকে আটক করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তাকে বেঁধে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে শ্রীপুরের জৈনা বাজার এলাকায় নিয়ে মহাসড়কের পাশে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেয়া হয়।
স্থানীয়রা সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় সুজনকে জীবিত উদ্ধার করে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন। পরে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে শ্রীপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। মর্গ সূত্রে জানা গেছে, সুজনের ফুফাতো ভাই সজীব মিয়া ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রহণ করেন। পরে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়েছে।
নিহতের চাচা মানিক মিয়া বলেন, ‘সুজন নিরীহ ও নির্দোষ ছিল। চোর সন্দেহে তাকে মারধর করা হয়েছে। স্বজনরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। তারা স্বাভাবিক হলে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নেবেন।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে ঘটনার তদন্তে নতুন সূত্র পেয়েছে পুলিশ। ভিডিওতে এক যুবককে বেঁধে মারধর করতে দেখা যায়। সেটি সুজনকে মারধরের ভিডিও কি না, তা নিশ্চিত করতে স্থান-কাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে।
শ্রীপুর থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, ‘শ্রীপুরে ময়লার ভাগাড়ে স্থানীয়রা সুজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে সে মারা যায়। খবর পেয়ে আমরা লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। শ্রীপুরে মারা গেলেও ঘটনা ঘটেছে ভালুকায়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে ঘটনাটি ভালুকা থানা এলাকায়। তাই আমরা ভালুকা থানাকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
অন্যদিকে ভালুকা মডেল থানার ওসি মো: জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রীপুর থানার ওসি আমার থানায় মামলা নেয়ার জন্য আমাকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ৭ তারিখ শেষ রাতে সুজনকে মারধর করা হয়েছে, ৮ তারিখ সন্ধ্যায় শ্রীপুরে তার মৃত্যু হয়েছে। তাই শ্রীপুর থানায় মামলা হয়ে তদন্ত হলেই পেছনের ঘটনা বেরিয়ে পড়বে। বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে তারা আমাকে এটিই জানিয়েছেন।’
পুলিশের দুই থানার বক্তব্যে মামলা দায়েরের দায়িত্ব কোন থানার — তা নিয়ে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়েছে। তবে সুজন চুরির সাথে জড়িত ছিলেন কি না, তাকে কারা আটক ও মারধর করেছিলেন এবং আহত অবস্থায় কারা তাকে শ্রীপুরে নিয়ে গিয়েছিল — এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
চুরির অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে আটকে মারধর করার বৈধতা নেই। সুজন সত্যিই চুরির সাথে জড়িত ছিলেন কি না, সেটি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে মারধর করা হয়ে থাকলে সেই ঘটনার দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
‘মুরাদ ইলেকট্রনিকস’-এর কর্মচারীরা দোকানে চুরির ঘটনা ঘটেছিল বলে জানালেও সুজনকে আটক, মারধর বা শ্রীপুরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। দোকান মালিকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
ঘটনার ১০ দিন পরও মামলা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, একজন মানুষকে চোর সন্দেহে আটকে মারধর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার অভিযোগের তদন্ত ও আইনি দায় নির্ধারণে আর কত সময় লাগবে?







