
ভোলার লালমোহন সবুজ ঘাসে ভরপুর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। এখানে নতুন আশা জাগিয়েছে মহিষপালন। মহিষপালনে লাভজনক সম্ভাবনা থাকলেও নানান সমস্যা ও সঙ্কটে ভুগছেন মহিষ মালিকরা। মহিষ পালনে ভাগ্য ফিরেছে উপকূলীয় জনপদের বহু মানুষের।
মহিষের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রি করে নগদ লাভের সম্ভাবনাও রয়েছে ব্যাপক। মূলত লালমোহন উপজেলাধীন ছোট বড় প্রায় আট থেকে দশটি চর রয়েছে। যার আয়তন কয়েক হাজার একরের বেশি।
বিস্তীর্ণ জঙ্গলে ঘেরা এসব চরের সবুজ ঘাসের বুকে দেখা মেলে শত শত মহিষ বাথানের। এসব চরসংলগ্ন আশপাশের এলাকা থেকে মহিষ মালিকদের রাখালরা ভাটার সময় চারণভূমিতে মহিষ ছেড়ে দেয়। এ সময় রাখালেরা খাল ও নদীর স্রোতে জাল পেতে মাছ ধরে সময় কাটান। সারা দিন ঘাস খাওয়া শেষে বিকেলে রাখালরা মহিষের পাল নিয়ে আশ্রয় নেয় খোলা আকাশের নিচে। উপজেলার চরাঞ্চলের মধ্যে অন্যতম একটি হলো মেঘনা নদীর মাঝে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ আট নম্বর চর। সে চরের কয়েকজন মহিষ মালিক ফয়েজ আহমেদ বেপারী, শ্রিধাম দাস, আবুল কাশেম গৌয়াল, ইসলাম গৌয়াল, শাহাবুদ্দিন মাঝি, কাঞ্চন মাল ও শিহাব মাল প্রমুখের প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মহিষ পালন করা হচ্ছে। এই চরাঞ্চলে মহিষ পালন দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনে দিয়েছে নতুন এক সম্ভাবনা।
মহিষ মালিক ফয়েজ আহমদ বেপারি বলেন, ‘বর্তমানে আমার দেড়শ’ মহিষ রয়েছে, তার মধ্যে ৩০টি বাচ্চা দিয়েছে। গত বছর জোয়ারের পানিতে আমার ১০টি মহিষ ভেসে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আট নম্বর চরে প্রায় দেড় হাজার মহিষ পালন করা হচ্ছে, কিন্তু এ চরে কিল্লা না থাকায় জোয়ার ও বন্যার সময় অনেক মহিষ নদীতে ভেসে যায়। আবার লবণাক্ত পানি পান করায় নানা ধরনের রোগ দেখা দেয়। চরে পশুডাক্তার না আসায় সমস্যায় পড়তে হয়।’
শাকিল, আরিফ, শামিম, নুর ইসলামসহ বেশ ক’জন মহিষ রাখাল জানায়, চর ছাড়া বড় পরিসরে মহিষ পালন করা সম্ভব নয়। গ্রামে ঘাসের সঙ্কট রয়েছে। তাই ভাটার সময় মেঘনা নদীর মধ্যে জেগে ওঠা চরে ঘাস খাওয়ানোর জন্য মহিষগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়।
একাধিক মহিষ মালিক জানায়, একেকটি মহিষের পেছনে বছরে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে থাকে। বছর শেষে বাচ্চা ও দুধ বিক্রি করে অনেক টাকা আয় করেন তারা।
চরের গবাদিপশুর মালিক, বর্গাদারসহ খামারিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলবর্তী চরাঞ্চলে মহিষ পালনে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও রয়েছে কয়েকটি সমস্যা। যেমন চরগুলোর হাজার হাজার হেক্টর জমি প্রভাবশালী মহল ও বন বিভাগের দখলে রয়েছে। এসব চরে গবাদিপশু চরালে মাসোয়ারা দিতে হয়।
উপজেলায় মহিষ পালনের জন্য উপযোগী চরের মধ্যে রয়েছে আট নম্বর চর, বৈষ্যার চর, ১২ নম্বর চর, উড়ির চর, বাদশা মিয়ার চর, চর সৈয়দপুর, চর কচুয়াখালী এগুলো।
একাধিক মহিষ মালিকের সাথে আলাপকালে তারা জানায়, আমাদের মহিষের দুধ ও দধি ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। আট নম্বর চরে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মহিষ পালন করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে সাত মন দুধ দোহন করে প্রতি মন দুধ তিন হাজার টাকা করে বিক্রি করা হচ্ছে।
ফয়েজ বেপারি বলেন, ‘শীতের শেষে নদীর পানি চার থেকে পাঁচ মাস লবণাক্ত থাকে। আর এ পানি খেয়ে গরু-মহিষের পাতলা পায়খানা, খুরা রোগ, গলা ফোলা, গায়ের পশম ঝরে যাওয়া ও উকুনসহ নানা রকম রোগ হয়ে থাকে। অনেক সময় মহিষ রোগাক্রান্ত ও মরা বাছুর প্রসব করে। পাশাপাশি চরগুলোর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করছে অসাধু জেলেরা। আর এসব পানি খেয়ে অনেক মহিষ মারাও যাচ্ছে।
মহিষ মালিক, (দুধের গোয়াল) দুধ ও দধি ব্যবসায়ীদের প্রাণের দাবি সরকারিভাবে যেন আট নম্বর চরসহ সব চরে জরুরি ভিত্তিতে কিল্লা ও নলকূপের ব্যবস্থা করা হয়। পশু চিকিৎসকের নজরদারিও কামনা করছেন তারা।
লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক বলেন, ‘মহিষের মালিকরা আমার কাছে এসে তাদের সমস্যা গুলো সম্পর্কে জানালে আমি শুনে সমাধান করার চেষ্টা করব।’







