ফ্রান্স, প্যারিস, আন্দোলন, প্রশাসন
গত ২৪ অক্টোবর প্যারিসে কয়েক হাজার মানুষের বিক্ষোভের দৃশ্য। নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সে আগামী ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হওয়ার পরিবর্তে শহরের প্রান্তবর্তী এলাকায় মিছিল করার নির্দেশ দেয়ায় শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করা ও জনসাধারণের কাছ থেকে আন্দোলনকে আড়াল করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

Advertisement

গত ১৭ অক্টোবরের পর থেকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার বিক্ষোভ আয়োজনের ক্ষেত্রে নতুন অবস্থান নেয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে কেবল ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভের অনুমতি দেয়া হবে এবং সেগুলোও শহরের কেন্দ্রস্থলের বাইরে বিকল্প পথে আয়োজন করতে হবে। সরকারের দাবি, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধ ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে সরকারের এই পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাদের মতে, বিক্ষোভ শুধু রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি নয়, বরং জনগণের সামনে নিজেদের দাবি ও অসন্তোষ তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মাধ্যম। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে দূরে বিক্ষোভ সরিয়ে নেয়া হলে সাধারণ মানুষের সাথে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ কমে যাবে। একই সাথে সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ ও আন্দোলনের সামাজিক প্রভাবও হ্রাস পেতে পারে।

২৭ বছর বয়সী গ্রাফিক ডিজাইনার নিনা আগামী শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসনের নির্ধারিত বিক্ষোভের পথ নিয়ে তিনি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, ‘এরপর কী হবে? আমাদের কি শেষ পর্যন্ত বোয়া দ্য বুলোনের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে আমরা একেবারেই মানুষের চোখের আড়ালে চলে যাই?’

নিনার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ও হতাশার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে একের পর এক বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েক দফা মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। প্রথমদিকে বিক্ষোভকারীরা বাস্তিল চত্বর থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিল করার পরিকল্পনা করেন। এ প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে সম্মতিও দিয়েছিল প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার।

কিন্তু পরে প্রশাসন আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। বিক্ষোভের আগের দিন বাস্তিল-নাসিওঁ পথের পরিবর্তে পোর্ত দ্য ইতালি থেকে পোর্ত দ্য ভিনসেন পর্যন্ত বিকল্প পথ নির্ধারণ করা হয়। প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি ওঠে আন্দোলনকারীদের মধ্যে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তবে বিক্ষোভের দিন আদালত প্রশাসনের নির্ধারিত বিকল্প পথের বৈধতা বহাল রাখে।

এবারো একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভের জন্য ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলের শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত জোট (ইন্টারসিন্ডিকাল) বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। কিন্তু প্রশাসন তাদের সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে পোর্ত দ্য বাগনোলে থেকে পোর্ত দ্য শারঁতঁ পর্যন্ত বিকল্প পথে বিক্ষোভ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাদের মতে, বারবার বিক্ষোভের পথ পরিবর্তন করে দেয়া হচ্ছে, যার ফলে আন্দোলনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থী সংগঠন ইন্টারফ্যাক আইডিএফ প্রশাসনের সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই বাস্তিল চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে।

সংগঠনটির এ আহ্বান থেকে বোঝা যায়, আন্দোলনের একটি অংশ আর প্রশাসনের নির্ধারিত বিকল্প পথ মেনে নিতে আগ্রহী নয়। তারা শহরের কেন্দ্রস্থলেই বিক্ষোভ আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও অন্য সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কর্মসূচি আয়োজন করা হবে, নাকি নির্ধারিত পথ উপেক্ষা করে প্রতিবাদ জানানো হবে; তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভিন্ন অবস্থান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফরাসি সরকারের অবস্থান হলো, বিক্ষোভের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা ও শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা জরুরি। অতীতে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সে কারণেই শহরের কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তে বিকল্প এলাকায় বিক্ষোভ আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংস ঘটনার দায়ে সব বিক্ষোভকারীকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো ও নিজেদের দাবি জনগণের সামনে তুলে ধরার অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম মৌলিক অধিকার।

তাদের যুক্তি, শহরের কেন্দ্রস্থল সাধারণ মানুষের চলাচল, গণপরিবহন, সংবাদমাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বাণিজ্যিক স্থাপনার কেন্দ্র। ফলে এসব জায়গায় বিক্ষোভ আয়োজন করলে আন্দোলনের বক্তব্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। শহরের প্রান্তে বিক্ষোভ সীমাবদ্ধ থাকলে সেই প্রভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে।

আগামী ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচি এখন ফ্রান্সের সামাজিক আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে প্রশাসন বিকল্প পথে বিক্ষোভ আয়োজনের বিষয়ে অনড়, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শহরের কেন্দ্রস্থল ছাড়তে নারাজ। বিশেষ করে শিক্ষার্থী সংগঠনের পক্ষ থেকে বাস্তিল চত্বর থেকে মিছিলের আহ্বান পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় বিক্ষোভের দিন প্রশাসন কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় ও আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত কোন পথে কর্মসূচি পালন করেন, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বিষয়টি কেবল বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণের বিরোধ নয়; বরং ফ্রান্সে নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন। সরকার যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের কার্যকর সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ আরো বাড়তে পারে।

অন্যদিকে আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও সম্পদহানির ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষের সমর্থন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রান্সে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রান্তে সরে যাওয়ার এই প্রবণতা আগামী দিনে দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচি শুধু একটি বিক্ষোভ নয়, বরং ফ্রান্সে প্রতিবাদের স্বাধীনতা ও জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।