প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন প্রকল্পে হরিলুটের অভিযোগ

শ্রমিকদের টাকা না দিয়ে কোষাগারে ইউএনও’র টাকা ফেরত, নেপথ্যে অর্থ আত্মসাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেয়া অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান প্রকল্প খাল খনন কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা

Location :

Amtali
আমতলী উপজেলার কেওয়াবুনিয়া খাল
আমতলী উপজেলার কেওয়াবুনিয়া খাল |নয়া দিগন্ত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেয়া অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান প্রকল্প খাল খনন কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক বছর আগে কাটা খাল পুনরায় খনন করে সদ্য বিদায়ী আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী অঢেল টাকা আত্মসাৎ করেছেন—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

আরো অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও শ্রমিকদের মজুরি না দিয়ে নাম কুড়াতে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরতের আড়ালে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে মহৎ উদ্যোগ নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন, ওই কর্মসূচি ভেস্তে গেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তাদের।

জানা গেছে, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমতলী উপজেলায় দুটি খাল খনন প্রকল্পের উদ্যোগ নেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর কুকুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম কেওয়াবুনিয়া খালের ৩ কিলোমিটার এবং হলদিয়া ইউনিয়নের পশুরবুনিয়া খালের ২ কিলোমিটার খননে এক কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৩৭ টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে কেওয়াবুনিয়া খালে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ এবং পশুরবুনিয়া খালে ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ হয়। ইউএনও মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী দায়সারা দুটি খালের ৪ কিলোমিটার খনন শেষে সরকারি কোষাগারে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ৫৪০ টাকা ফেরত দিয়েছেন। বাকি টাকা ইউএনও ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রুনু বেগম উত্তোলন করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, খাল খননে ৩৯৭ জন হতদরিদ্র শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ করেছেন ১৫৯ জন। ওই শ্রমিকেরা এখনো তাদের দৈনিক মজুরির পুরো টাকা পাননি। কিছু টাকা দিয়ে বাকি টাকা ‘আজ-কাল দেবো’ বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা টালবাহানা করছেন। খাল খনন শেষে ইউএনও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য খালের দুই পাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করেছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো গাছ নেই।

আরো অভিযোগ রয়েছে, গত এক বছর আগে কেওয়াবুনিয়া খালের এক পাশ কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ওই খালই এ বছর পুনরায় খনন করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় ও শ্রমিকদের অভিযোগ, খাল খননের টাকা এখনো শ্রমিকেরা পাননি, সে জায়গায় ইউএনও কীভাবে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেন? বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি তাদের।

তাদের আরো অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে মহৎ উদ্যোগ নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন, ওই কর্মসূচি ভেস্তে গেছে। ইউএনও ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ভাগবাটোয়ারা করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

স্থানীয় নুর আলম ও সেকান্দার খাঁন বলেন, কাটা খাল ইউএনও কেটে গেছেন। এক বছর আগে এ খালের এক পাশ কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল।

শ্রমিক ওমর গাজী, মারুফ হাওলাদার ও সুমন হাওলাদার বলেন, ছয় দিন কাজ করেছি। তিন দিনের টাকা পেয়েছি, বাকি টাকা এখনো পাইনি।

শ্রমিক নাজমুল বলেন, ছয় দিন কাজ করেছি, তাতে মাত্র দেড় হাজার টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা এখনো পাইনি। টাকা চাইতে গেলে দেবো বলে টালবাহানা করতে থাকেন।

তিনি আরো বলেন, আমি শ্রমের টাকা পাইনি, কিন্তু ইউএনও কীভাবে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেন? বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

ভেকু মেশিন মালিক মো: জামাল সিকদার বলেন, ‘২২০০ মিটার খাল খনন কাজ করেছি। তাতে মাত্র ৩ লাখ টাকা দিয়েছেন প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য জহির মাদবর। বাকি টাকা এখনো পাইনি।’

কেওয়াবুনিয়া খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি কুকুয়া ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো: জহির উদ্দিন মাতুব্বরের অভিযোগ, তাকে কাগজে-কলমে প্রকল্প সভাপতি করা হলেও সব কাজ করেছেন ইউএনও, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও তাদের লোকজন। ‘আমি তাদের হুকুম পালন করেছি মাত্র। এখানে আমার কোনো দায় নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘কেওয়াবুনিয়া ৩ কিলোমিটার খাল খননে ১৮ লাখ টাকা চুক্তিতে ভেকু মেশিন ঠিক করা হয়। ওই ভেকু মেশিন দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে।’ তবে তিনি এ খাল আগে কেটে রাস্তা নির্মাণের কথা অস্বীকার করেছেন।

পশুরবুনিয়া খাল খনন প্রকল্প সভাপতি হলদিয়া ইউপি সদস্য কালু মৃধা বলেন, ‘দুই কিলোমিটার খাল খননের বরাদ্দ হলেও তা কাটা হয়নি। ভেকু মেশিন দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। ভেকু মেশিন মালিককে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিল দিয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘কাগজে-কলমে প্রকল্প সভাপতি করা হলেও বাস্তবে আমি কিছুই না। আমি ইউএনও স্যার ও পিআইও কর্মকর্তার কথামতো কাজ করেছি। তারা যেভাবে করতে বলেছেন, আমি সেভাবে করেছি।’

তিনি জানান, খাল খনন কাজ শেষ হলেও ১১৯ জন শ্রমিক কাজ করেছেন, তাদের কাউকে এখনো মজুরির টাকা দেয়া হয়নি। ‘শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির টাকার জন্য ইউএনওর কাছে বেশ কয়েকবার গিয়েছি এবং বলেছি, কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি।’

আমতলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রুনু বেগম বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দিকনির্দেশনা মোতাবেক খাল খনন কাজ শেষ করেছি।

শ্রমিকেরা মজুরির টাকা পাননি—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প সভাপতির সাথে আলোচনা করুন, সমুদয় টাকা দেয়া হয়েছে।’

সদ্য বিদায়ী আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মাদ জাফর আরিফ চৌধুরী বলেন, ‘আমি একটু ব্যস্ত আছি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন, তিনিই সব জানেন।’

তবে শ্রমিকদের মজুরি না দিয়ে নাম কুড়াতে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।