বৈদেশিক ঋণের জালে আমাদের অর্থনীতি
বৈদেশিক ঋণের জালে আমাদের অর্থনীতি। সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকার পালিয়ে যাওয়ার আগের যে ভঙ্গুর অর্থনীতি ছিল তা এখনো দাঁড়াতে পারেনি। জনগণ আশা করেছিল, নতুন সরকারের মাধ্যমে অর্থনীতি শিগগির ঘুরে দাঁড়াবে। মানুষ মূল্যস্ফীতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধ্যের মধ্যে থাকবে। রফতানি বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদনশীল খাতগুলো গতিশীল হবে। কিন্তু এখনো আমরা কাঙ্ক্ষিত, গতিশীল ও টেকসই অর্থনীতি তৈরি করতে পারিনি। এক্ষেত্রে অর্থনীতির চলার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা আছে। তবে আমাদের অর্থনীতি এখনো বৈদেশিক ঋণের জালে আবদ্ধ। ২০২৬ থেকে ২০৩০— এই পাঁচ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশকে দুই হাজার ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হবে। এই ঋণভার বিশাল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫৪ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ যেখানে চার হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে, সেখানে আগামী পাঁচ বছরে এ খাতে ব্যয় করতে হবে উপর্যুক্ত পরিমাণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

Advertisement

তথ্যসূত্র অনুযায়ী দেখা যায়, গত বছরের জুন মাস নাগাদ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল সাত হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা আমাদের জাতীয় আয়ের ১৯ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে ঋণ ও সরকারি আয়ের অনুপাত ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূলত ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ ও ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি— এ দুই দিক থেকে অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও সঠিক তদারকি। 
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের আকার ও ধরন : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে বাজেট সহায়তা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশের মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৪১ শতাংশ, যার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ-জিডিপির অনুপাত প্রায় ১৮—২২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (৪০ শতাংশ) অনুযায়ী এটি এখনো সহনীয় সীমার মধ্যে আছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের ঋণের বোঝা কাঙ্ক্ষিত নয়। 
বর্তমানে দেশের জনপ্রতি মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৫৪ দশমিক ৯০ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৮০ হাজার টাকার কাছাকাছি)। 

ঋণের ধরন : বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ মূলত দুই ধরনের— ১. খাতভিত্তিক (সরকারি ও বেসরকারি);  ক. সরকারি খাতের ঋণ। দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের  বেশির ভাগ সরকারি খাতের দখলে, যার পরিমাণ প্রায় ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। সরকার মূলত বহুপক্ষীয় সংস্থা (বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ) এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের (জাপান, রাশিয়া, চীন) কাছ থেকে এ ঋণ নিয়েছে।

 খ. বেসরকারি খাতের ঋণ: বর্তমানে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক মন্দায় সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ নেয়ার প্রবণতা কিছুটা কমেছে।

২. মেয়াদভিত্তিক (দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি) : মেয়াদভিত্তিক মূলত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দেখা যায়। দেশে মোট ঋণের প্রায় ৮৭ শতাংশের বেশি দীর্ঘমেয়াদি। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প (যেমন— রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেগা প্রকল্পগুলো) এবং বাজেট সহায়তায় এ ঋণ নেয়া হয়। এ ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড (রেয়াতকাল) বেশি থাকে। অন্যদিকে দেশের মোট ঋণের প্রায় ১২—১৩ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি। এগুলো মূলত বেসরকারি খাতের ক্রেডিট, ডেফার্ড পেমেন্ট বা বাণিজ্য অর্থায়নের উদ্দেশ্যে নেয়া হয়। অন্য আর একটি খাত হলো শর্তভিত্তিক। এর মধ্যে একটি নমনীয় অন্যটি শর্তযুক্ত।

নমনীয় ঋণের অর্থাৎ (সরকারি ঋণ) বড় অংশ (প্রায় ৬২ শতাংশ) নমনীয় ঋণ বা সহজ শর্তের। এগুলোর সুদের হার অনেক কম থাকে (সাধারণত ১-২ শতাংশের নিচে)। সেই সাথে পরিশোধের সময়সীমা দীর্ঘ হয়। অন্যটি কঠিন শর্তের ঋণ যা বাণিজ্যিক বা বাজারভিত্তিক সুদের হারে নেয়া, যেগুলোর সুদের হার তুলনামূলক বেশি এবং পরিশোধের মেয়াদও কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের বেশির ভাগ বা প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল সরকারি খাতের। বাকিটা বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের। ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ ছিল ২০ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ডলার সঙ্কট কাটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেয়া হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নেও ঋণ নেয়া হয়। এসব প্রকল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে না। এ জন্য সরকারকে ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়ের অর্থের ওপর নির্ভর করতে হবে। 

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি ডলার। এ অর্থ বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের মোট বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সালে তা বেড়ে হয় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। ওই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর চব্বিশে জুলাই দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বিদেশী ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলারে। অন্তর্বর্তী সরকার ডলার সঙ্কট মেটাতে ঋণ নেয়। ফলে ২০২৫ সালে বিদেশী ঋণ বেড়ে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে বর্তমানে ঋণ পরিশোধের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে ঋণ পরিশোধের চাপ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এটি সামলিয়ে ওঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

করণীয় : বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বিনিময় হারের ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ পরিশোধে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। এ পরিস্থিতিতে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল বেশি পাওয়া সম্ভব, সেগুলোর অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সাথে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও অপচয় কমাতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন ঋণ নেয়ার আগে প্রকল্পের সম্ভাব্য আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের দায় বিবেচনায় নেয়া জরুরি। পাশাপাশি করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমানে জ্বালানি খাতে, যেখানে বিনিয়োগ বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান বহু সমস্যার সমাধানে অপরিহার্য। ঋণ সিদ্ধান্ত পরিশোধ ক্ষমতার ওপরে নির্ভরশীল, যার জন্য রফতানির প্রসারণ এবং রাজস্ব পরিসীমার বিস্তার অপরিহার্য।
নতুন ঋণের ধাক্কায় অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এড়াতে সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। এক্ষেত্রে রফতানি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর আয় নিশ্চিতকরণের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সঙ্কট ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা— এ তিন চ্যালেঞ্জের চাপে আছে দেশের অর্থনীতি। সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতজনিত অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতির সীমাবদ্ধতায় অর্থনীতির ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর উত্তরণে বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্প উৎপাদন গতিশীল করা, রফতানি আয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স আহরণে জোর প্রচেষ্টা ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্ট আয় থেকে ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন ব্যয়ের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখা। এ জন্য এক দিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ রক্ষা করতে হবে। অন্য দিকে ডিজিটাল আর্থিক সেবায় নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। 

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার 
main706@gmail.com