
উপমহাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হলো সুন্নাহর অনুসরণ, আল্লাহমুখী জীবন এবং দ্বীনের খেদমতের মানসিকতা। আর এর অন্যতম ভিত্তি হলো আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা, দ্বীনি মেজাজ, ইখলাস ও তাকওয়া। কওমি মাদরাসার বৈশিষ্ট্য শুধু তার সিলেবাস বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নয়; বরং এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ইলমের গভীরতা, আমলে সৌন্দর্য, আল্লাহভীতি, ইখলাস ও দ্বীনের জন্য ত্যাগী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা। আল্লাহ তায়ালা কোনো জাতিকে সম্মান, মর্যাদা ও প্রভাব দান করেন তাদের ঈমান, আমল, চরিত্র, আল্লাহ পাকের সাথে সম্পর্ক এবং দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে। তারা যখন নিজেদের দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে সরে যায়, তখন ধীরে ধীরে তাদের মর্যাদার কারণগুলোও বিলুপ্ত হতে থাকে। তাই কওমি মাদরাসার বর্তমান সঙ্কটের কারণ ও উত্তরণের পথ নির্ধারণ করতে হলে শুধু বাহ্যিক কারণ নয়, আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোর দিকেও তাকাতে হবে।
সনদ নয়, লক্ষ্য যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম তৈরি
কওমি মাদরাসার মূল লক্ষ্য সনদের স্বীকৃতি আদায় কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন নয়। এর লক্ষ্য হলো— এমন যোগ্য মুত্তাকি ও দূরদর্শী আলেম তৈরি করা যারা কুরআন-সুন্নাহ গভীরভাবে অনুধাবন করে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং সমাজের নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবেন। আকাবিরে দেওবন্দের অনেক আলেম শিক্ষা সমাপনান্তে কোনো সনদই গ্রহণ করেননি। কারণ সনদ অর্জন তাদের লক্ষ্য ছিল না; বরং নিজেকে যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম হিসেবে গড়ে তোলা এবং নিজেকে দ্বীনের একজন সাচ্চা খাদেম হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য।
সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচ্য
সনদের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। কিন্তু স্বীকৃতির নামে যদি কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হয়, দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ, মূলনীতি ও মতপথের এবং বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী হয়, তাহলে সে স্বীকৃতি কওমি মাদরাসার মূল উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। কারণ আমাদের প্রধান চিন্তা হলো— ইলম, আমল, আখলাক ও যোগ্যতার সমন্বয়ে প্রকৃত মুত্তাকি আলেম তৈরি করা। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা:-এর বিখ্যাত উক্তি : ‘আমরা এক লাঞ্ছিত জাতি ছিলাম, আল্লাহ পাক ইসলাম দ্বারা আমাদের সম্মানিত করেছেন, অতএব ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো পথে সম্মান খুঁজলে, আল্লাহ তায়ালা সম্মানের পরিবর্তে আমাদেরকে অপদস্ত করে দেবেন।’ মনে রাখতে হবে, এ ধরনের পদ পজিশনের স্বার্থে আমাদের বিচ্যুতি কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা বিনষ্ট ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা অনিবার্য।
স্বকীয়তা ও যুগসচেতনতা
এর অর্থ আবার এমন নয় যে, কওমি মাদরাসার আলেমরা যুগের পরিবর্তন ও সমকালীন সমস্যার ব্যাপারে অসচেতন থাকবেন; বরং কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী ফিকহের আলোকে যুগের নতুন সমস্যা অনুধাবন এবং তার সমাধান দেয়ার মতো যোগ্য আলেম তৈরি করাও জরুরি। যে ব্যক্তি নিজের যুগ ও সমকালীন মানুষের অবস্থা সম্পর্কে অবগত নয় তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ। এই কথাটি আমাদেরকে বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে। একইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা কর্মসংস্থানের উপযোগী করে শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিকায়নের নামে ঢেলে সাজালে দ্বীনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা, নিজস্ব সিলেবাস, বাহ্যিক কাঠামো, ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নাহর অনুসরণ, ইলমের গভীরতা ও আকাবিরে দ্বীনের রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের বৈষম্য
২০১৮ সালে আইন পাসের মাধ্যমে দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির-ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সমমানের স্বীকৃতি দেয়া হলেও, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কওমি আলেমদের সে অনুযায়ী মর্যাদা দেয়া হয়নি। একই মানের বা কখনো তুলনামূলক কম মানের সনদধারীরা যেখানে উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতির সুযোগ পান, সেখানে কওমি আলেমদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ খুবই সীমিত রাখা হয়েছে। এনটিআরসিএ নিবন্ধন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কওমি শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা রয়েছে। তাদের মূল শিক্ষার বিষয় কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, আরবি, উর্দু, ফার্সি, নাহু-সরফ ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ পরীক্ষায় তাদেরকে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রতিযোগিতা করতে হয়। এতে একটি বিশেষায়িত দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। মূলত অবাস্তব জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে বঞ্চিত অপবাদের একটি ফাঁদ পাতা হয়েছে। এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সহশিক্ষা বা এমন কর্ম পরিবেশ, যেখানে কওমি আলেমদের পর্দা ও দ্বীনি আদর্শ লালন করা কঠিন। সেখানে কওমি আলেমদের চাকরির সুযোগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ঈমান আমল ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার।
কারি সনদ ও বাস্তব দক্ষতা
গত ১২ জুলাই ২০২৬ বেফাকুল মাদারিসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) উত্তীর্ণদের কিরাত ও তাজবিদ বিষয়ে পরীক্ষার কথা জানানো হয়েছে; কিন্তু কিরাত এমন একটি ব্যবহারিক দক্ষতা, যা শুধু লিখিত পরীক্ষায় বা হিফজের সনদের ভিত্তিতে পুরোপুরিভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। মাখারিজ, সিফাত ও তিলাওয়াতের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আয়ত্ব করতে কোনো যোগ্য উস্তাদের তত্ত্বাবধায়নে নিয়মিত মশক অপরিহার্য। তাই কারি হিসেবে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি কাওয়াইদের মানদণ্ডে তিলাওয়াত ও দক্ষতায় যথাযথ পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত।
মূল কিতাবকেন্দ্রিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনা
কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ছিল মূল কিতাবকে কেন্দ্র করে ইলম চর্চা করা। শুধু নোট বা অনুবাদনির্ভর পড়াশোনা নয়; বরং ইবারত পাঠ, নাহু-সরফের যথাযথ প্রয়োগ, মূল আরবি থেকে সরাসরি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা অর্জন করা। কিন্তু বর্তমানে নোট-নির্ভরতা, অনুবাদ-নির্ভর পড়াশোনা, গাইড বুকের ব্যাপকতার কারণে ছাত্রদের মূল কিতাবের সাথে সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই মূল কিতাবকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে, যাতে করে ছাত্রদের আরবিতে এমন দক্ষতা তৈরি হয়, তার পাঠের বইতে ও যেকোনো আরবি সে হরকত ছাড়া পড়তে, অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়।
দাওরায়ে হাদিস দু’বছর করা
দাওরায়ে হাদিসের এক বছরের সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। এত অল্প সময়ে সিহাহ সিত্তার বিশাল হাদিস ভাণ্ডার যথাযথভাবে পড়ানো ও বুঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ওপরও বিরাট চাপ সৃষ্টি হয়। বুখারি শরিফসহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবগুলো তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে হয়। ত্বহাবি শরিফ, মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক রহ., মুয়াত্তায়ে ইমাম মুহাম্মদ রহ. কিতাবগুলোর জন্য আরো বেশি সময় বরাদ্দ করা দরকার। তাই দাওরায়ে হাদিস কোর্স দু’বছরের করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
ইসলামী শিক্ষায় দক্ষ ব্যক্তি তৈরি করা
কওমি মাদরাসার উদ্দেশ্য বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, প্রকৌশলী কিংবা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহ, তাফসির, হাদিস, ফিকাহ ও সংশ্লিষ্ট ইসলামী জ্ঞানে দক্ষ আলেম তৈরি করা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী যুগ সচেতনতা তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার ও প্রাশ্চাত্যের শিক্ষা, সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবেলা করার মতো দূরদর্শিতা সম্পন্ন আলেম তৈরি করা। তবে একসাথে একজন ব্যক্তিকে উচ্চমানের আলেম, ডাক্তার, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী বানানোর অবাস্তব প্রত্যাশায় মূল দ্বীনি শিক্ষার গভীরতা নষ্ট করা উচিত নয়।
আমাদের সুপারিশ
১. তাসাউফ ও আখলাকের গুরুত্বপূর্ণ কিতাব সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা।
২. ফিরাকে বাতেলা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় কিতাব নিসাবভুক্ত করা।
৩. শিক্ষার্থীদের লেখা সুন্দর করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা।
৪. কওমি শিক্ষকদের স্থায়ীভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুসারে স্থাপন করা।
৫. মাদরাসার বাইরের মুসলিম সন্তানদের পবিত্র কুরআন ও প্রয়োজনীয় দ্বীন শিক্ষাদানে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬. ইসলামী সিয়াসত শিক্ষার একটি জরুরি অনুসঙ্গ। অধ্যয়নরত অবস্থায় এটি শিখবে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত অবস্থায় এর চর্চা থেকে বিরত থাকবে।
৭. দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি, আদর্শের সুরক্ষা এবং ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে পাশকৃত ৪৮নং আইন মোতাবেক সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
লেখক : সভাপতি, কওমি মাদরাসা
শিক্ষক পরিষদ
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








