মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি জুলাই সনদের আলোকে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও একই সাথে দু’টি— ১. জাতীয় সংসদ সদস্য ও ২. সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, তা হয়নি। তাই ৭০ শতাংশ ভোটারের রায়ের প্রতিফলন দেখল না দেশবাসী। তারা প্রত্যাশায় ছিলেন— কথা রাখবে নতুন সরকার। আট মাস পরও জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত স্রোত বইছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, দলীয়করণ, বাজার সিন্ডিকেট, পতিত ফ্যাসিস্টদের দৌরাত্ম্যে একে একে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের চেতনা। এসব বাধা অপনোদনের দায়িত্ব সরকারের। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বাড়লে ক্ষত বড় হতে থাকবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের গঠনমূলক সম্পর্কের মধ্যে দেশ-জনগণের শত্রু এবং পতিত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি শুধু দেয়াল নয়, বিষবৃক্ষের জন্ম দেবে। সেই লক্ষণও স্পষ্ট হচ্ছে।  
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার (হাসপাতাল) ভাঙচুরে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। একই সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যাকে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা বলা যায়। যেমন : পরিচিত ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের পরপর তার ব্যাংক হিসাব তলব, তার শ্বশুরের গোডাউন সিলগালা করা এবং বিমানবন্দরে হয়রানির প্রতিবাদ করায় সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার ও হেফাজতে নেয়া ইত্যাদি। 
জনপ্রত্যাশা ছিল— রাড্ডার ঘটনায় দায়ীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাতের অন্ধকারে রাড্ডা ক্লিনিক দখলের ঘটনায় অবশেষে সরকার ও সরকারি দল বাধ্য হয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কিন্তু এত বড় অপকর্মের জন্য শুধু সাংগঠনিক পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়। কালপ্রিটদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশবাসী দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য আইনি পদক্ষেপ দেখতে চায়। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ও লুণ্ঠিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের দায়িত্বও সরকারকে পালন করতে হবে।’ 
 বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে যারা কমবেশি পরিচিত, তাদের কারো অজানা নয়, অতীতে বিএনপি এমন গঠনমূলক বিরোধী দল পায়নি; বরং পেয়েছে ‘এক দিনও শান্তিতে থাকতে দেবো না’— ঘোষণা দিয়েছে, ১৭৩ দিন সহিংস হরতাল করেছে। অথচ বর্তমান বিরোধী দল প্রতিদিন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে, আমরা বিরোধিতার কারণে বিরোধিতায় বিশ্বাসী নই।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হলেও তাদের নীতি গঠনমূলক। তারা কেবল বিরোধিতার খাতিরে সরকারের সব কাজের অন্ধ বিরোধিতা করছে না এবং করবেও না। তবে সরকারের এমন যেকোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ; যা জনস্বার্থের পরিপন্থী বা জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তার বিরুদ্ধে শক্ত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজপথে এবং সংসদে প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং জানাতেই থাকবে। তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো কল্যাণমুখী উদ্যোগে এবং দেশের সঙ্কট নিরসনে জামায়াত সরকারকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা ও সমর্থন অব্যাহত রাখবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক সংসদীয় চর্চা বজায় রাখাই জামায়াতে ইসলামীর মূল লক্ষ্য। সরকারের দায়িত্ব গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সরকারে যারা আছেন, তাদের মনে রাখতে হবে— একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল বিরোধী দল অত্যন্ত জরুরি।’
সরকারি দলে দুধের মাছির অভাব হয় না। তারা নিজের দল, দলীয় নীতি ও আদর্শের প্রতি আস্থায় নয়, দেশপ্রেম ও জনসেবার মানসেও নয়, আসে নিজের ভাগ্য বদলানোর বাসনা পূরণে। এরাই দল, সরকার ও রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে তাদের অপরাধ আড়াল করার ঢাল হিসেবে। স্বার্থ ফুরালে দল, দেশ ও জনগণ বিপদে পড়লে তারা দ্রুত রঙ বদলে শত্রুপক্ষের হাতে হাত মেলায়। এদের কঠোর হস্তে দমন করে দেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত রচনা করার সুযোগ নিতে পারে সরকার। 
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভারতের কাছে সমমর্যাদা দাবি করে চোখে চোখ রেখে কথা বলা এবং হাসিনার প্রশ্নে ভারতের সাথে আচরণ ইতিবাচক হয়েছে। মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন এবং চীন ও আমেরিকানরা সাথে ভারসাম্যমূলক কূটনীতির ফল দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার একমুখী পরনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে চীন, ইউরোপ, আমেরিকা, আবর বিশ্ব, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের অন্যতম প্রয়াস দেশবাসীকে ভারতের দাসত্ব থেকে মুক্তির স্বাধ দিচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের সদ্যসমাপ্ত অধিবেশে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসন, ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের পক্ষে সুস্পষ্ট ইতিবাচক অবস্থান বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। ভারতনির্ভর কূটনৈতিক প্রভাব বলয় থেকে ঢাকাকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে। বড়, শক্তিশালী ও স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতাকারী দেশ ইত্যাদি বয়ান তৈরি করে ভারত বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত শোষণ করছে। দেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম এবং ভাষা ও সংস্কৃতি এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যে দিকে প্রতিবেশী আধিপত্যবাদী ভারত কালো হাত প্রসারিত করেনি। 
ষড়যন্ত্রকারীদের প্রথম নিশানা ঐক্যে ফাটল ধরানো। এই নীলনকশার বাস্তবায়ন করতে চানক্যবাদী অপশক্তি পতিত ফ্যাসিস্ট ও রাজনীতির চাদরে মুখ ঢাকা দুর্বৃত্তদের নিয়োগ করেছে। তারা সরকার, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে ইঁদুর, উইপোকা আর ঘুণপোকার মতো ধীরে ধীরে ঐক্যের বন্ধন কাঁটছেন। অপেক্ষা করছেন সময়-সুযোগের। বিষয়টি সরকারকে সতর্কতার সাথে নজরে রাখতে হবে। 

Advertisement