
বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের বিষয়টি এখন শুধু দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং সারা বিশ্বেই আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনের শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন (NPL) দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ যা বর্তমানে বিশ্বের সব দেশের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০ টাকার মধ্যে প্রায় ছয় টাকাই এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ ঋণে (ডিস্ট্রেসড লোন) পরিণত হয়েছে। গত ১৬ জুন ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল ঋণব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ১৮ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অধিকাংশই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।
সাধারণত যেসব ঋণের বিপরীতে গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ে আসল বা সুদ পরিশোধ করতে পারেন না এবং ব্যাংকগুলোর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়, সেগুলোকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বা সম্পদ বলা হয়। খেলাপি ঋণের সাথে পুনঃতফসিল, আদালতের স্থগিতাদেশ ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হিসাব করা হয়।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোতে কি এমন ঘটনা ঘটেছে যে, খেলাপি ঋণের বিশাল পর্বত তৈরি হলো? বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সশস্ত্র সঙ্ঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদ এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সঙ্কট, মানবিক বিপর্যয় বিরাজ করছে। যেমন, সুদান, ফিলিস্তিন, মিয়ানমার, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, সিরিয়া, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (DRC), হাইতি, আফগানিস্তান, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, লেবানন, লিবিয়া, ইরাক, মোজাম্বিক ও ক্যামেরুন ইত্যাদি। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন গত পাঁচ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত আছে। কিন্তু বাংলাদেশ তো কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি, এমনকি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীনও হয়নি। অথচ সব দেশ ছাড়িয়ে বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে!
বর্তমানে চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, বেলারুশ, আফগানিস্তান, ইরান, সৌদি আরব, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, সিরিয়া, সুদান, দক্ষিণ সুদানসহ বিশ্বের প্রায় ৪০টির বেশি দেশে দীর্ঘ সময় ধরে একনায়কতন্ত্র চলছে। এ শাসনব্যবস্থা সাধারণ মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক, মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু সেসব দেশের সরকার তাদের ব্যাংকিং খাত তথা অর্থনীতি ধ্বংস করে দিচ্ছে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে একটি সরকার মাত্র ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শুধু উন্নয়নের কথাই শোনা গেল; কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর দেখা গেল প্রকৃত তথ্য, অর্থনীতির বেহাল দশা বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে কতিপয় লুণ্ঠনকারীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ফলে আর্থিক খাত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো।
ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাজপথে প্রতিদিন অসংখ্য পথশিশুকে দেখা যায়। এই বিশাল পৃথিবীতে তাদের রাত কাটানোর জন্য নিজের বলে এক টুকরো নিরাপদ জায়গা নেই। অন্যদিকে, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্যসীমার নিচে বসবাস করে। প্রতি বছর ১০-১২ লাখ উচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে, যাদের অধিকাংশই বেকার থাকছে অথবা শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কাজ পাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে মোট বেকার আছে ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাদের মধ্যে ২৯ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। দেশের একদিকে যখন বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে কতিপয় ন্যূনতম দেশপ্রেমহীন ও সম্পূর্ণ বিবেকবর্জিত মানুষ সবার চোখের সামনেই আর্থিক খাতের ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে দেশের স¤পদ পাচার করে এদেশের সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দিলো!
ব্যাংক খাতে বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অবারিত লুণ্ঠন না চললে এবং সুস্থ ধারায় চললে বর্তমান সময়ে দেশে ব্যাংকিং সেক্টরের আকার (আমানত) প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৪০ লাখ কোটি টাকার মতো হতো। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা সচল থাকত এবং প্রায় তিন কোটি বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো।
ব্যাংকের টাকা মূলত জনগণের টাকা। একজন আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে যে, প্রয়োজনের সময় তিনি তার অর্থ ফেরত পাবেন। ব্যাংক সেই আমানতের অর্থ ঋণ হিসাবে বিনিয়োগ করে এবং ঋণ থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ আমানতকারীকে দেয়। কিন্তু ঋণের অর্থ যদি ফেরত না আসে, ব্যাংকের স¤পদ ক্ষয় হতে থাকে। এক পর্যায়ে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়, তারল্য সঙ্কট দেখা দেয় এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা, আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য তারল্য সহায়তা, মূলধন পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, পুনঃমূলধনীকরণ, স¤পদ বিক্রি কিংবা বিশেষ তহবিলসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। এসব ব্যবস্থার অর্থ যখন শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থ বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আসে, তখন এর পরোক্ষ বোঝা পড়ে করদাতা বা সাধারণ জনগণের ওপর।
ব্যাংক খাতের বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ এবং অর্থপাচারের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ব্যাংক খাতে বিশাল ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়, তাই রাষ্ট্রকেই এ সমস্যা সমাধানে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ বা পাচারের ক্ষতি যেন সাধারণ আমানতকারী ও করদাতাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া না হয়, বহন করতে না হয়। দুর্বল ব্যাংককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি যারা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন, তাদের স¤পদ থেকে ক্ষতি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারকে একই সাথে ব্যাংক পরিচালনা, ঋণ অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেয়া এবং বড় ঋণের ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শুধু অতীতের অর্থ উদ্ধার করলেই হবে না; ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঘটনা আবার না ঘটে, তার জন্য ব্যাংকিং সুশাসন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
লেখক : ব্যাংক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
ma_masum@yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








