মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সুদূর ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশী নাগরিকদের নিথর দেহের সারি কেবল আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের নৃশংসতার প্রমাণ নয়, এটি আমাদের সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরের এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বেশি অর্থ  আয় অর্থাৎ একটু ভালো থাকা, একটু উন্নত জীবনের আশা দেখিয়ে এই সাধারণ মানুষদের প্রতারণার জালে জড়িয়ে ফেলা হয়। প্রলুব্ধ হয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় তারা। কিন্তু চাকরি বা কাজের সংস্থান নয়, তাদেরকে যুদ্ধের একেবারে সম্মুখভাগে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, আধুনিক সমরাস্ত্রের এই যুগে প্রতিপক্ষের ড্রোন ও গোলন্দাজ বাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত করতে এদের এক ধরনের মানবঢাল বা ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই চক্রের স্থানীয় হোতারা আইনি জালে ধরা পড়লেও, যে মৌলিক সঙ্কটের কারণে এমন নির্মম পরিণতি বারবার ঘটছে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের এখন গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি কিংবা দূর দেশের সীমানা বিরোধকে আমরা সাধারণত দূরবর্তী কোনো ঘটনা বলেই গণ্য করি। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে সুদূর সীমান্তের যুদ্ধ যে এদেশের প্রান্তিক পরিবারের ঘর অন্ধকার করে দিতে পারে, তা এক নির্মম বাস্তব রূপ নিয়েছে। এই অভিবাসীরা কোনো সামরিক গৌরব বা যুদ্ধের উন্মাদনায় সেখানে যাননি। তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে এক অলীক অর্থনৈতিক সচ্ছলতার স্বপ্ন এবং দেশের ভেতরে সম্মানজনক আয়ের সুযোগের চরম অভাব। সর্বস্ব বিক্রি করে বা ঋণের জালে জড়িয়ে যেকোনো উপায়ে ভাগ্য বদলের এই যে মরিয়া চেষ্টা করেন তারা। আর সেটিকেই কাজে লাগিয়ে সুকৌশলে তাদেরকে শিকার বানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটগুলো। পরাশক্তিদের নিজেদের স্বার্থের লড়াইয়ে আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকরা সস্তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে, এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
এই বেদনাদায়ক পরিস্থিতি আমাদের প্রচলিত বৈদেশিক শ্রমবাজারের তদারকি ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতার দুর্বলতাকেও স্পষ্ট করে তোলে। যুদ্ধকবলিত এলাকায় কর্মসংস্থানের নামে যখন এমন ভিসা ইস্যু হচ্ছিল, তখন আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি কেন তা শনাক্ত করতে পারল না, সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি। কেবল অপরাধের পর তদন্ত বা গ্রেফতার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এনে দিতে পারে না।
এখন প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো, মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং এখনো রণক্ষেত্রে অবরুদ্ধ থাকা বাকি নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ স্তরের কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। পাশাপাশি, রেমিট্যান্সের মোড়কে মানবসম্পদ রফতানির নামে এ ধরনের গোপন মৃত্যুফাঁদগুলো চিরতরে বন্ধ করতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আরো কঠোর ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামো দাঁড় করাতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও নিরাপদ অভিবাসনের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে, আমাদের যুবসমাজের স্বপ্নগুলো দূর দেশের বারুদের ধোঁয়ায় হারিয়ে যেতেই থাকবে, যার দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। রাষ্ট্র কত দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে এবং জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় থাকা বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনতে পারে সেই অপেক্ষায় এখন গোটা বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। 
লেখক : সাংবাদিক

Advertisement