মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাত সবচেয়ে আগে এবং গভীরভাবে অনুভূত হবে কৃষিতে। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষককে একই সাথে বাড়তি সেচব্যয়, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, ফসল কাটা ও পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের খরচ বহন করতে হবে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়লেই কৃষক সেই বাড়তি খরচ ফসলের দামের সাথে সমন্বয় করতে পারেন না। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে কমে যেতে পারে প্রকৃত আয়। এই চাপ শুধু কৃষকের পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে খাদ্যবাজার পর্যন্ত। 
কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে আছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগও দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম পরিবহন, কৃষি, খাদ্য, শিল্প ও সেবা খাতে নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের ব্যবহারও ব্যাপক। বাস, ট্রাক ও নৌযান চলাচল থেকে শুরু করে কৃষির সেচ, শিল্পের যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব এক খাতে আটকে থাকে না; ধীরে ধীরে তা পণ্য ও সেবার দামের মধ্য দিয়ে ভোক্তার ঘাড়ে চেপে বসে। 
কৃষিতে এই অভিঘাত তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কারণ, উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবহার রয়েছে। জমি প্রস্তুত, চাষ, সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে জ্বালানি ব্যয় জড়িত। ডিজেলনির্ভর সেচের খরচ বাড়লে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। কৃষকের আয় এমনিতেই বাজারদর, আবহাওয়া ও উৎপাদনের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনের সময় খরচ বাড়লেও ফসল ওঠার সময় বাজারদর কমে গেলে সেই বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতা কৃষকের থাকে না। এখানেই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় বৈপরীত্য। ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি কৃষককে তাৎক্ষণিকভাবে বহন করতে হয়; কিন্তু বাড়তি দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা তার থাকে না। এতে পরবর্তী মৌসুমে আবাদ কমানো, কম খরচের ফসল বেছে নেয়া কিংবা প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ কমানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব খাদ্য সরবরাহেও পড়তে পারে।
মাঠের এই বাড়তি ব্যয়ের ধাক্কা সেখানেই থেমে থাকবে না, পৌঁছে যাবে বাজারেও। কৃষিপণ্য মাঠ থেকে স্থানীয় হাট, সেখান থেকে পাইকারি বাজার এবং পরে শহরের খুচরা বাজারে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে পরিবহন, সংরক্ষণ ও সরবরাহের খরচ রয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে এসব ব্যয়ও বাড়বে। একই সাথে সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম ও কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের খরচ বাড়লে কৃষকের কার্যকর মূলধনের প্রয়োজনও বাড়বে। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সহজলভ্য না হলে ক্ষুদ্র কৃষকের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে পারেন। তখন উৎপাদন ব্যয়ের সাথে ঋণের সুদের চাপও যুক্ত হবে। 
কৃষকের এই সঙ্কটকে আরো জটিল করে তুলছে বাজারব্যবস্থার নানা দুর্বলতা। ফসল কাটার পর দ্রুত বিক্রি করতে হয় অনেক কৃষককে, কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণসুবিধা নেই। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারদর অনুকূলে না থাকলে তিনি কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। বাজারের বিভিন্ন স্তর ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দরকষাকষির ক্ষমতাও অনেক সময় কৃষকের পক্ষে থাকে না। ফলে মাঠে যে কৃষক বাড়তি ব্যয় বহন করেন, বাজারে গিয়ে সেই ব্যয়ের ন্যায্য প্রতিফলন তিনি পান না। অন্যদিকে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়। বাসভাড়া বাড়া, চাল-সবজির দাম বাড়া কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি তাদের মাসিক বাজেটকে আরো চাপে ফেলবে। শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী এবং ডিজেলনির্ভর সেচের ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার তাই বিশেষ ঝুঁকিতে থাকবে। 
অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকার অনির্দিষ্টকাল ভর্তুকি দিয়ে যেতে পারে না। এতে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল হতে পারে। ফলে প্রশ্নটি শুধু জ্বালানি সস্তা রাখা বা দাম বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি খাতের দক্ষতা, ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থা, কর ও শুল্ক কাঠামো এবং মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ডিজেলের করভার ও মূল্যবৃদ্ধির সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনায় নেয়া জরুরি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সৌরসেচ এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। একই সাথে কৃষক শনাক্তকরণ, স্বচ্ছ অর্থ প্রদানব্যবস্থা ও ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করার ব্যবস্থা দরকার। 
রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষকের কৃষিঋণের প্রয়োজন বাড়তে পারে; কিন্তু ঋণের ব্যয় বেশি থাকলে নতুন বিনিয়োগে তার আগ্রহ কমতে পারে। স্বল্প সুদের প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণ, ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো, কৃষিপণ্য পরিবহনে দক্ষতা এবং কৃষকের বাজারসংযোগ উন্নত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে নীতিগত প্রতিক্রিয়াও হতে হবে বহুমাত্রিক। শুধু জ্বালানির দাম বাড়ানো কিংবা নির্বিচারে ভর্তুকি দেয়ার মধ্যে সমাধান খোঁজা যথেষ্ট নয়। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পদ্ধতি প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরের স্থায়ী ব্যয়চাপ আলাদাভাবে বিবেচনা করা যায়। কর ও শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালন ব্যবস্থা, ক্রয়পদ্ধতি ও বিতরণ ব্যবস্থার অদক্ষতাও চিহ্নিত করা দরকার। সবার জন্য জ্বালানি সস্তা রাখার বদলে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষি ও প্রয়োজনীয় গণপরিবহনের মতো খাতকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেয়া যেতে পারে। কৃষির ক্ষেত্রে এই সহায়তা শুধু জ্বালানি ভর্তুকিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সৌরসেচ, জ্বালানিসাশ্রয়ী কৃষিযন্ত্র, স্বল্পসুদের কৃষিঋণ, ফসল সংরক্ষণ এবং সরাসরি বাজারসংযোগের সাথে যুক্ত করা প্রয়োজন। স্থানীয় সংগ্রহকেন্দ্র, শীতল সংরক্ষণ ও দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, করকাঠামোর পর্যালোচনা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ছাড়া শুধু মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, কৃষকের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি মোকাবেলায় কৃষক ও ভোক্তার সুরক্ষা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং কৃষকের ন্যায্য বাজার সংযোগকে একই নীতির অংশ করতে হবে। 
লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
rssarker69@gmail.com

Advertisement